সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ মাঠে এখন রোপা আমনের সবুজ সমারোহ। কোথাও ধানের শীষ দোল খাচ্ছে, কোথাও ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি চলছে। অনুকূল আবহাওয়ায় ভালো ফলনের আশা জাগলেও কৃষকের মনে স্বস্তি নেই। কারণ, ফসল ফলাতে গিয়ে বাড়তি উৎপাদন খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে তাঁদের। ডিজেল, সার ও সেচের ব্যয় বৃদ্ধি কৃষকের লাভের হিসাবকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আবাদ বাড়লেও উৎপাদন খরচের চাপে কৃষকের মুখে হাসি না ফুটলে কৃষির এই অগ্রগতি কতটা অর্থবহ হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮২ হাজার ৬৬০ হেক্টর। আবাদ হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭০ হেক্টর বেশি জমিতে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। তবে আবাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কৃষকদের হিসাবে, গত বছর প্রতি বিঘা জমিতে আমন চাষে খরচ হয়েছিল ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০ থেকে ২২ হাজার টাকায়। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় কয়েক হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে হচ্ছে তাঁদের।
সুনামগঞ্জের কৃষি বাস্তবতা অন্য অনেক অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। হাওরাঞ্চলের নিচু জমিতে জলাবদ্ধতা, আকস্মিক বন্যা, খরা, পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি রয়েছে। মধ্যনগর ও জামালগঞ্জের নিচু এলাকার অনেক জমি এখনো পানিতে ডুবে থাকার বিষয়টিও কৃষির অনিশ্চয়তাকে সামনে আনে। মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির অভাবে কোথাও কোথাও সেচের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে কৃষকদের। ফলে ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থা তাঁদের ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। প্রকৃতির অনিশ্চয়তার সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের এই চাপ কৃষকের জন্য দ্বিমুখী সংকট।
কৃষক শুধু ফসল উৎপাদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই ফসল বিক্রি করে উৎপাদন ব্যয় তুলে সংসার চালানোও তাঁর বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে ধানের দাম উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে ভালো ফলনও কৃষকের জন্য কাক্সিক্ষত সুফল বয়ে আনবে না। এতে কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজেল ও সারের দাম সহনীয় রাখা, সেচব্যবস্থায় ব্যয় কমানো, কৃষি উপকরণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগের পরামর্শ জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ধান কাটার মৌসুমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সরকারি সংগ্রহ কার্যক্রমে প্রকৃত কৃষকের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং প্রয়োজনে স্বল্প সুদে কৃষিঋণ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করা জরুরি।
কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো কেবল তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করারও পূর্বশর্ত। মাঠে ধানের সবুজ সমারোহ তখনই প্রকৃত সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠবে, যখন ফসল ঘরে তোলার পর কৃষক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন। তাই আমনের আবাদ বাড়ার সাফল্যকে অর্থবহ করতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিষয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।