দুর্গম হাওরে ব্যাহত প্রসূতিসেবা, সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানোই চ্যালেঞ্জ, নৌ-অ্যাম্বুলেন্স ও ভাসমান হাসপাতালের দাবি

আপলোড সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৯:১৪:০৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-১০-২০২৬ ০৯:১৫:৩৬ পূর্বাহ্ন
শহীদনূর আহমেদ::
হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের দুর্গম জনপদে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বর্ষাকালে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকায় নৌকাই হয়ে ওঠে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। এতে গর্ভবতী নারীদের সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো মাঝপথেই সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটে, আবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি হওয়ায় মা ও নবজাতকের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। শাল্লাসহ জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

শাল্লা উপজেলার তাজপুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব জুবেদা খাতুনের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতারই চিত্র তুলে ধরে। মাসখানেক আগে সকালে তাঁর নাতবউ বিলকিস বেগমের প্রসবব্যথা শুরু হয়। বাড়িতে দিনভর চেষ্টা করেও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় স্বজনেরা তাঁকে নৌকায় করে শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই নৌকায় প্রসবব্যথা বেড়ে যায়। উপায় না পেয়ে হাওরের পাশের একটি উঁচু স্থানে নৌকা ভেড়ানো হয়। সেখানেই ঝুঁকির মধ্যে সন্তান প্রসব করেন বিলকিস। জুবেদা খাতুন জানান, আগে ধাত্রী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি নিজেই প্রসব করানোর চেষ্টা করেন। মা ও সন্তান দুজনই বেঁচে যাওয়াকে অলৌকিক ঘটনা বলে মনে করেন তিনি। শুধু শাল্লা নয়, বর্ষায় দুর্গম যাতায়াতের কারণে দিরাই, শান্তিগঞ্জ, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার হাওরাঞ্চলেও প্রসূতিসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়েন নারীরা। ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রসবসেবাকেন্দ্রের অভাব, প্রশিক্ষিত ধাত্রীর সংকট, জরুরি নৌযানের অপ্রতুলতা এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যাতায়াতের অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলে। পাশাপাশি গর্ভকালীন প্রস্তুতি ও স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
শাল্লার শান্তিপুর গ্রামের স্কুলশিক্ষিকা পল্লবী রাণী বলেন, শাল্লা একটি দুর্গম এলাকা। গ্রাম পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। নারীস্বাস্থ্য নিয়েও অনেকের সচেতনতার অভাব আছে। নৌযানের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রসূতিদের সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। এতে মা ও শিশু উভয়েই ক্ষতির মুখে পড়েন। এ পরিস্থিতিতে দ্রুতগামী নৌযান চালুর পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে দক্ষ ধাত্রী তৈরির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ধাত্রীরা কিছুটা হলেও ভরসা জোগাচ্ছেন। শাল্লার আটগাঁও ইউনিয়নের উজানগাঁও গ্রামের প্রশিক্ষিত ধাত্রী ক্ষমা রাণী জানান, একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে তিনি ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এরপর বিভিন্ন গ্রাম থেকে প্রসূতিসেবার জন্য তাঁর কাছে ফোন আসে। তিনি গর্ভবতী নারীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। খবর পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ছুটে যান। ক্ষমা রাণী বলেন, গত এক বছরে তিনি অর্ধশত নারীর নিরাপদ সন্তান প্রসবে সহায়তা করেছেন। পাশাপাশি প্রসূতি নারী ও কিশোরীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন। জরুরি প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ নম্বরে যোগাযোগ করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সহায়তা পাওয়ার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করছেন।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দেবব্রত আইচ মজুমদার বলেন, দুর্গম হাওরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। নৌনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। এ সমস্যা মোকাবিলায় দ্রুতগামী স্পিডবোটের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্পিডবোটচালকের যোগাযোগ নম্বর গ্রামে গ্রামে প্রচার করা গেলে জরুরি প্রয়োজনে রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া সহজ হবে।
তিনি বলেন, সরকারি টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই কার্যক্রমের মাধ্যমে গর্ভবতী নারীদের তালিকা করা হয়। স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি গর্ভকালীন ও প্রসবকালীন করণীয় সম্পর্কে সচেতন করেন। তবে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই গ্রাম পর্যায়ে আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া জরুরি। এতে সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই ঝুঁকিতে থাকা প্রসূতিদের কাছাকাছি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা সম্ভব হবে। সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বলেন, হাওরাঞ্চলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্য বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বর্ষায় জরুরি পরিবহনের ব্যবস্থা করতে জেলার দুটি উপজেলায় একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রসূতিদের পারাপারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, হাওরে নৌকায় ভাসমান হাসপাতালের প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ভাসমান হাসপাতাল মানে একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল। যেখানে প্রসূতিদের ডেলিভারির ব্যবস্থা থাকবে। এই হাসপাতাল রোগীর সন্ধানে গ্রামে গ্রামে যাবে। 

বিশেষজ্ঞদের মতে হাওরাঞ্চলে মাতৃ ও শিশু মৃত্যু শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হাওরের পরিবেশ প্রতিবেশ ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে সরকারি বেসরকারি ও সমাজভিত্তিক নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

গ্রাম পর্যায়ে আবহাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা প্রচার, গর্ভবতী নারীদের আগাম নিবন্ধন, সম্ভাব্য প্রসবের তারিখভিত্তিক প্রস্তুতি এবং জরুরি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সেবা নিশ্চিত করা। দুর্গম এলাকায় বসবাসকারী ও অধিক ঝুঁকিতে থাকা গর্ভবতী নারীদের চিহ্নিত করা। বর্ষা ও দুর্যোগের আগে নিরাপদ প্রসবের জন্য হাসপাতাল বা মাতৃসদনে যেতে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। কমিউনিটি ক্লিনিক ও পরিবারকল্যাণকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রসবপূর্ব পরামর্শ দেওয়া। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রসবের তারিখ ও জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষণ। দুর্যোগের সময় কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্র খোলা আছে, কোথায় প্রসূতিসেবা পাওয়া যাচ্ছে এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছানো যাবে, তা নিয়মিত জানানো।
ব্যক্তি ও সমাজভিত্তিক করণীয়:
জরুরি পরিবহনের জন্য যোগাযোগের নম্বার সংগ্রহ করা। দুর্গম এলাকায় রোগী পরিবহনের জন্য স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন। রাতে কিংবা দুর্যোগের সময় প্রসূতিদের হাসপাতালে নেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। নৌযান চলাচল বন্ধ থাকলে বিকল্প নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা। সম্ভাব্য প্রসবকালীন সময়ে আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করা। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, বজ্রপাতসহ আবহাওয়ার তথ্য জানতে সংবাদভিত্তিক টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও আবহাওয়াভিত্তিক অ্যাপস ঞযব ডবধঃযবৎ ঈযধহহবষ, অপপঁডবধঃযবৎ, গবঃবড়ৎবফ, ডবধড়িি সহ বিভিন্ন ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করা।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com