হাওরের বোরো আবাদ নিয়ে মনগড়া হিসাব কাম্য নয়

আপলোড সময় : ০৬-১১-২০২৬ ০৯:৫৭:৫০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৬-১১-২০২৬ ০৯:৫৭:৫০ পূর্বাহ্ন
হাওরাঞ্চলের কৃষি কেবল একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা, খাদ্যনিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত। সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরে বছরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধান। পাহাড়ি ঢল, আগাম বন্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করে কৃষকেরা এই ফসল ফলান। অথচ সেই কৃষির আবাদ, উৎপাদন ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়েই যদি প্রশ্ন ওঠে, তবে তা শুধু পরিসংখ্যানের অসংগতি নয়; হাওরের কৃষি উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্যও বড় উদ্বেগের বিষয়। সুনামগঞ্জে বোরো আবাদে কৃষি বিভাগের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বিতর্ক সেই উদ্বেগকেই সামনে এনেছে। চলতি বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। অথচ গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে লক্ষ্যমাত্রায় খুব সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। জমির ব্যবহার, জলবায়ুর প্রভাব, নদী-খাল ও জলাশয়ের পরিবর্তন, বসতি সম্প্রসারণ এবং পতিত জমির বাস্তব চিত্র বিবেচনায় না নিয়ে এভাবে প্রায় একই ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে তার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আরও উদ্বেগজনক হলো, উৎপাদন ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিয়ে কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। গত বোরো মৌসুমে আগাম বন্যা ও ফসলহানির ব্যাপকতা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়েছে। মাঠের বাস্তবতা ও সরকারি হিসাবের মধ্যে যদি বড় ধরনের ব্যবধান থাকে, তবে তার নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জরুরি। কারণ, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে প্রণীত পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত কৃষকের প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ হয়। সুনামগঞ্জ খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা - এমন সরকারি দাবির যথার্থতাও নির্ভর করে নির্ভরযোগ্য উৎপাদন ও চাহিদার হিসাবের ওপর। কাগজে উদ্বৃত্ত দেখালেই কৃষকের ঘরে পর্যাপ্ত ধান থাকে না। ফসলহানির পর ঋণের বোঝা, উৎপাদন ব্যয় এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার সংকট কৃষকের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। তাই সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল থাকা অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করলেও তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট চিত্র, মাঠ জরিপ এবং কৃষকের সরাসরি মতামত কাজে লাগিয়ে আবাদ ও উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে আগের বছরের ছক অনুসরণের বদলে বাস্তব পরিস্থিতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা মনে করি, সুনামগঞ্জের বোরো আবাদ, উৎপাদন ও ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান নিয়ে নিরপেক্ষ যাচাই হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি স্বচ্ছ করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত অভিযোগগুলোকে অস্বীকার না করে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা। হাওরের কৃষককে সহায়তা করতে হলে প্রথমেই তাঁর বাস্তব পরিস্থিতি জানতে হবে। ভুল পরিসংখ্যান দিয়ে উন্নয়নের চিত্র সাজানো যায়, কিন্তু কৃষকের সংকট দূর করা যায় না। হাওরের কৃষি রক্ষায় তাই মনগড়া হিসাব নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, জবাবদিহি ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com