হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে অবহেলার সুযোগ নেই

আপলোড সময় : ০৮-১১-২০২৬ ১২:৫৪:৪০ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৮-১১-২০২৬ ১২:৫৪:৪০ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকের সারা বছরের স্বপ্ন এক ফসলি বোরো ধান। এই ফসল ঘরে তুলতে পারা না পারার ওপর নির্ভর করে লাখো কৃষক পরিবারের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ। অথচ সেই ফসল রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম নিয়েই প্রতি বছর তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। হাওরের পানি কমতে শুরু করেছে, কৃষকরা বোরো আবাদে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অথচ ফসলরক্ষা বাঁধের প্রাথমিক কার্যক্রমই এখনো শুরু হয়নি। এর চেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় আর কী হতে পারে! প্রতি বছর অক্টোবর মাসে হাওরের বাঁধের প্রাক্কলন ও জরিপ কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। এরপর ১৫ ডিসেম্বর থেকে বাঁধের কাজ শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এবার সার্ভেয়ারদের দেখা নেই। তার ওপর ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ পাঁচজন উপসহকারী প্রকৌশলী (এসও) বদলি হয়েছেন। গত দুই মাসে নির্বাহী প্রকৌশলীর পদেও একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন ঘন ঘন বদলি স্বাভাবিকভাবেই প্রশাসনিক সমন্বয় ও কাজের ধারাবাহিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের মতো মৌসুমভিত্তিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বদলির সময় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো পরিকল্পনা নেই কেন? একটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা, বাঁধের অবস্থান, ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্ট এবং স্থানীয় সমস্যা বুঝে কাজ করতে কর্মকর্তাদের সময় প্রয়োজন। কাজের মৌসুমে একের পর এক কর্মকর্তা বদলি হলে নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের সবকিছু বুঝে উঠতেই মূল্যবান সময় চলে যায়। এর দায় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় কৃষককে। সুনামগঞ্জের হাওরগুলো প্রতিবছরই পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। মার্চের শেষ কিংবা এপ্রিলের শুরুতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই তলিয়ে যেতে পারে হাজার হাজার হেক্টর বোরো ফসল। তখন কৃষকের সারা বছরের পরিশ্রম, বিনিয়োগ ও স্বপ্ন পানির নিচে হারিয়ে যায়। তাই বাঁধ নির্মাণে সামান্য বিলম্বও এখানে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বাঁধ নির্মাণ শুধু মাটি কাটার কাজ নয়। এর সঙ্গে জড়িত সঠিক জরিপ, প্রকল্প নির্বাচন, বরাদ্দ, বাস্তবায়ন, তদারকি এবং সময়মতো কাজের মান নিশ্চিত করা। প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে স¤পন্ন করতে হলে শুরু থেকেই দায়িত্বশীলতা ও সমন্বয় থাকতে হবে। অথচ প্রতি বছরই কেন জরিপ ও প্রকল্প প্রণয়নে বিলম্ব হয়, কেন শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে কাজ করতে হয়, তার জবাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দিতে হবে। আমরা মনে করি, এখনই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। ফসলরক্ষা বাঁধের কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদগুলোতে দ্রুত স্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সার্ভেয়ার পাঠিয়ে অবিলম্বে হাওরের বাঁধগুলো জরিপ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিতকরণ এবং প্রকল্প প্রণয়নের কাজ শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প অনুমোদন ও বরাদ্দের প্রক্রিয়াও দ্রুত স¤পন্ন করতে হবে। কাজের মৌসুমে অপ্রয়োজনীয় বদলি বন্ধ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, হাওরের কৃষকের হাতে বিকল্প কোনো ফসল নেই। একটি বোরো মৌসুমের ক্ষতি মানে একটি পরিবারের সারা বছরের স্বপ্নভঙ্গ। তাই বাঁধ নির্মাণে প্রশাসনিক স্থবিরতা কিংবা দায়িত্বহীনতার কোনো অজুহাত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পানি কমছে, সময়ও ফুরিয়ে আসছে। এখন প্রয়োজন আশ্বাস নয়, দৃশ্যমান উদ্যোগ। হাওরের ফসল রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখনই সক্রিয় হতে হবে। কৃষকের একমাত্র ফসল নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা পরীক্ষানিরীক্ষার সুযোগ নেই।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com