
স্টাফ রিপোর্টার ::
গ্রাম-গঞ্জের মাঠ থেকে শুরু করে হাটবাজার, যানবাহন স্ট্যান্ড, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এমনকি পাড়া-মহল্লায় এখন অনলাইন জুয়ার ছড়াছড়ি। সুনামগঞ্জে উঠতি বয়সী তরুণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ ইন্টারনেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ও অ্যাপসের ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে ভিনদেশি প্ল্যাটফর্ম ‘ওয়ান এক্স বেট’ ঘিরে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। মাস্টার, সুপার মাস্টার ও সাধারণ এজেন্টের মাধ্যমে পরিচালিত এই জুয়ার আসরে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হচ্ছে। বিকাশ ও নগদই তাদের প্রধান অর্থ লেনদেনের মাধ্যম।
শুধু সুনামগঞ্জ পৌর শহরেই ১০-১৫ জন মাস্টার ও সুপার এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম ও সীমান্তবর্তী উপজেলা তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, জাউয়াবাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে এই জুয়ার নেটওয়ার্ক। একটি সুপার এজেন্টের মাধ্যমে মাসে ১ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়ে থাকে বলে জানা গেছে।
ওয়ান এক্স বেটের নেশায় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও যুবকরা নিঃস্ব হয়ে পথে বসছেন। কেউ হারিয়েছেন চাকরি, কেউ জমি-বাড়ি বিক্রি করে দেনার দায় মেটাচ্ছেন। অপরদিকে জুয়ার ফাঁদে পেলে সাধারণের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে অবৈধ সম্পত্তির মালিক বনে যাচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্র।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার রমরমা বাজার এখন সুনামগঞ্জ। জেলা শহর থেকে শুরু করে গ্রামীণ পর্যায়ে বিস্তার লাভ করেছে অনলাইন জুয়ার একাধিক চ্যানেল। ‘ওয়ান এক্স বেট’ নামের একটি অনলাইন জুয়ার প্লাটফর্মে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে পরিচালতি হয়ে থাকে জুয়ার আসর। যার নিয়ন্ত্রণ করে নির্দিষ্ট চ্যানেলের এজেন্ট। এজেন্ট রয়েছে তিন ধরণের মাস্টার, সুপার মাস্টার ও সাধারণ এজেন্ট। একজন জুয়াড়ি নির্দিষ্ট এজেন্টের মাধ্যমে ওয়ান এক্স বেট সাইটে একাউন্ট খুলে এজেন্টের কাছ থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ডিপোজিট ক্রয় করে বাজি ধরে থাকেন।
অনুসন্ধানে আরও জানাযায়, ওয়ান এক্স বেটের ‘হট স্পট’ সুনামগঞ্জ পৌর শহর। পৌর এলাকার একাধিক পাড়া-মহল্লায় রয়েছে অনলাইন জুয়ার এজেন্ট। এছাড়াও তাহিরপুর, দোয়াবাজার, ছাতক, শান্তিগঞ্জ, জাউয়াবাজারসহ একাধিক স্থানে ওয়ান এক্স বেটের নিরাপদ স্থান হিসেবে চিহ্নিত জুয়াড়িদের কাছে।
সূত্র বলছে, ওয়ান এক্স বেটের তিন প্রকার এজেন্টেরে মাধ্যমে এই ব্যবসা পরিচালনা করছেন একাধিক সক্রিয় সিন্ডিকেট। সুপার মাস্টার, মাস্টার ও সাধারণ এজেন্টের মাধ্যমে জুয়াড়িদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সুনামগঞ্জ পৌর শহরে ১০ থেকে ১৫ জন মাস্টার ও সুপার মাস্টার এজেন্ট রয়েছে। যাদের মাধ্যমে এই জুয়া পরিচালতি হয়ে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার গ্রামে-গঞ্জে শতাধিক সাব এজেন্ট রয়েছে। একেকটি সুপার এজেন্টের মাধ্যমে মাসে ১ থেকে ৩ কোটি টাকার ট্রানজেকশন হয়ে থাকে বলে জানাযায়। অনলাইন জুয়ার লেনদেনের মাধ্যম বিকাশ ও নগদ বলে জানিয়েছে একাধিক সূত্র।
অপরদিকে, ওয়ান এক্স বেটের জুয়ার ব্যবসা করে রাতারাতি বাড়ি গাড়ি ও অবৈধ সম্পত্তির মালিক হয়েছেন সিন্ডিকেটের অনেকেই। কেউ কেউ অনলাইন ব্যবসা ও অবৈধ সম্পত্তি ঢাকতে অন্য ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছেন।
এদিকে অনলাইন জুয়া ওয়ান এক্সের লোভনীয় খেলার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন ব্যবসায়ি, চারিজীবীসহ উঠতী বয়সী তরুণরা। অনেকেই হারিয়েছেন চাকরি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও জায়গা জমি। তবে ওয়ান এক্স এজেন্ট সিন্ডিকেট প্রভাবশালী হওয়ায় মুখ খুলতে সাহস পাননা ভুক্তভোগীরা।
মিনহাজ তালুকদার নামে এক ক্ষতিগ্রস্ত যুবক বলেন, ওয়ান এক্স বেট আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে। আমি লোভে পড়ে এই জুয়ায় আসক্ত ছিলাম। আমি এই জুয়ার ফাঁদে পড়ে ৩৩ লাখ টাকা খুইয়েছি। আমি এখন দেনার দায়ে বাড়িঘর ছাড়া। ফাঁদ পেতে অনেক এজেন্ট আমাদের মতো যুবকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। জাউয়াবাজারে ওয়ান এক্সের অনেক এজেন্ট রয়েছে। আমি জাউয়াবাজারে কয়েকজন এজেন্টের ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়েছি। প্রশাসন যদি তথ্য চায় আমি তাদের নাম প্রকাশ করবো। আমি চাই আমার মতো আর কারো জীবন যেন নষ্ট না হয়।
কেবি রাজু ইসলাম নামের এক যুবক বলেন, কিশোর থেকে যুবক সবার হাতে হাতে মোবাইল। আর এই মোবাইলের মাধ্যমে ওয়ান এক্স জুয়া চলছে। ওয়ান এক্সের ফাঁদ এখন ঘরে ঘরে। শহর থেকে সকল পর্যায়ে ওয়ান এক্স বেটের জুয়ায় আসক্ত যুবকরা। এটি বন্ধে কোনো আইনশৃংখলাবাহিনীর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
পৌর শহরের বাসিন্দা সাকিরিন আহমদ বলেন, পৌরসভার মল্লিকপুরে ওয়ান এক্সের এজেন্ট রয়েছে। যাদের এক সময় কিছুই ছিলনা, এখন তারা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। দামি বাইক চড়ে বেড়ায়। এরা যুবসমাজকে নষ্ট করছে। এ ব্যাপারে প্রশাসনের যথাযথ পদক্ষেপ কামনা করছি।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জাকির হোসেন বলেন, অনলাইন জুয়ার বিষয়ে আমরা অভিযোগ পাই। তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করলে পুলিশ অভিযান চালিয়ে জুয়াড়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।