বাংলাদেশের জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার সম্প্রতি যে ‘টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর সুরক্ষা আদেশ’ জারি করেছে, তা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওর শুধু সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের গর্ব নয়, বরং গোটা বাংলাদেশের এক অমূল্য প্রাকৃতিক স¤পদ। এই দুই হাওর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি, যেখানে পরিযায়ী পাখি, জলজ প্রাণী ও নানা প্রজাতির উদ্ভিদের সহাবস্থান আমাদের প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিন ধরে এই হাওরগুলো অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, নিষিদ্ধ চায়না জালের ব্যবহার, বালু উত্তোলন, রাসায়নিক দূষণ ও জলজ বন ধ্বংসের মতো কর্মকা-ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে। স্থানীয় জনগণের জীবিকা, পরিবেশ এবং প্রাণবৈচিত্র্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। সরকার যে ১৯ দফা নির্দেশনা দিয়েছে, তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এই সংকট অনেকাংশে লাঘব হবে বলে আশা করা যায়।
বিশেষ করে হাওরে পাখি শিকার, জলজ বন কাটা, অনুমতি ছাড়া ভূমি শ্রেণি পরিবর্তন, বালু উত্তোলন, শব্দদূষণ, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যবহার ও বর্জ্য নিঃসরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ, হাউসবোট চলাচলের নিয়ম এবং স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশনাও দায়িত্বশীল ভ্রমণ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে।
তবে শুধু আদেশ জারিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও হাওর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ, জেলে ও পর্যটন সংশ্লিষ্টদের সচেতন করা জরুরি। কারণ হাওরের সুরক্ষা কেবল সরকারি নির্দেশে নয়, জনগণের অংশগ্রহণেই টেকসই হবে।
টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর শুধু জলাশয় নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবনের অংশ। প্রাকৃতিক এই সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক জীবন্ত, প্রাণবন্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতি উপহার দিতে পারব - এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।