সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ এখন কেবল একটি মৌসুমি কার্যক্রম নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে কৃষকের জীবন-মরণ প্রশ্ন। প্রতিবছর বোরো মৌসুমে ফসলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এসব প্রকল্পের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাজ হয় বিলম্বে, নি¤œমানের, আর অনেক সময় অক্ষত বাঁধকেও দেখানো হয় ক্ষতিগ্রস্ত - যাতে প্রকল্প বাড়িয়ে বরাদ্দ আত্মসাৎ করা যায়।
এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় এক হাজার কিলোমিটার বেড়িবাঁধ সার্ভে করে ছয় শত কিলোমিটার সংস্কারের লক্ষ্য নিয়েছে। বরাদ্দের অঙ্ক প্রাথমিকভাবে ৪৫ কোটি টাকা হলেও চূড়ান্ত বরাদ্দ শত কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বিপুল অঙ্কের অর্থের যথাযথ ব্যবহার কি নিশ্চিত হবে? কৃষকরা আশঙ্কা করছেন, আবারও আগের মতো কাগজে-কলমে ক্ষয়ক্ষতির গল্প তৈরি করে অক্ষত বাঁধ মেরামতের নামে লুটপাটের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যথার্থভাবেই বলেছেন- যেখানে গত দুই বছর বড় ধরনের বন্যা হয়নি, সেখানে অধিকাংশ বাঁধই অক্ষত। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কৃষকদের পরামর্শ ছাড়া কেন বারবার ইঞ্জিনিয়ারদের একক সিদ্ধান্তে সার্ভে করা হয়? হাওর এলাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় জ্ঞানকে বাদ দিয়ে কাগুজে পরিকল্পনা নিলে তা কখনো টেকসই হয় না।
অতীতে দেখা গেছে, পিআইসি গঠন থেকে কাজের বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে অনিয়ম, পক্ষপাতিত্ব ও তদবির চলে। এতে প্রকৃত কৃষক নয়, বরং সুবিধাভোগীরা লাভবান হন। অন্যদিকে, প্রকল্পের নি¤œমানের কাজের ফলে সামান্য বন্যাতেই বাঁধ ভেঙে কৃষকের রক্ত-ঘামে ফলানো ফসল তলিয়ে যায়। এখন সময় এসেছে এই চক্র ভাঙার। পাউবো’র মাঠ পর্যায়ের সার্ভে টিমকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক সার্ভে কমিটি গঠন করা জরুরি। প্রতি বছরের মতো “বাঁধের নামে বরাদ্দ লোপাট” যেন না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে।
হাওর আমাদের জাতির খাদ্যভা-ার। এই ভা-ারের ফসলরক্ষার বাঁধ যদি দুর্নীতি ও অনিয়মের বাঁধে পরিণত হয়, তবে কৃষকের দুর্ভোগ যেমন বাড়বে, তেমনি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে- অক্ষত বাঁধকে ক্ষতিগ্রস্ত দেখানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, প্রতি বছর বাঁধের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের আস্থার দেয়ালও ভেঙে পড়বে।