দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে তিনটি পরিবারকে কার্যত অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনা আমাদের সমাজ ও প্রশাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। জায়গা-সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে প্রায় ২৫ জন মানুষ, যাদের মধ্যে নারী ও স্কুলগামী শিশুও রয়েছে, মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এ ঘটনা শুধু অমানবিকই নয়, সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনেরও শামিল।
সংবাদে উঠে এসেছে, আদালতের নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের নেতৃত্বে প্রতিপক্ষের বাড়ির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপন করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য যেখানে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, সেখানে সেই নির্দেশনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের চলাচল বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আইন কখনোই কাউকে অবরুদ্ধ করার হাতিয়ার হতে পারে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো- একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মানেই জনগণের প্রতিনিধি, যাঁর দায়িত্ব মানুষের অধিকার রক্ষা করা, বিরোধের ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানে ভূমিকা রাখা। অথচ অভিযোগ সত্য হলে তা জনপ্রতিনিধিত্বের মৌলিক চেতনার সঙ্গে স¤পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
এই ঘটনায় স্থানীয়দের নীরবতাও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। ‘প্রভাবশালী’ পরিচয়ের কারণে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না - এটি আইনের শাসনের জন্য অশনিসংকেত। ভয় ও প্রভাবের সংস্কৃতি চলতে থাকলে দুর্বল ও সাধারণ মানুষই বারবার বঞ্চিত হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে না পারা শিশুদের ভবিষ্যৎ, ঘর থেকে বের হতে না পারা নারীদের নিরাপত্তা এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন - সবকিছুই এখানে প্রশ্নের মুখে। এটি কোনো ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও প্রশাসনিক কার্যকারিতার পরীক্ষা।
আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও কার্যকর হস্তক্ষেপ জরুরি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হবে, কাঁটাতারের বেড়া অপসারণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের ভূমি বিরোধ নিরসনে আইনি ও প্রশাসনিক মধ্যস্থতা প্রয়োজন।
একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো নাগরিক কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দী থাকবে - এটি মেনে নেওয়া যায় না। আইন ও জনপ্রতিনিধিত্ব যদি সাধারণ মানুষের পক্ষে না দাঁড়ায়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। দিরাইয়ের এই ঘটনা দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে সমাধান হোক - এটাই আমাদের প্রত্যাশা।