বাংলাদেশ আবারও এক অশনি সংকেতের মুখোমুখি। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ধারাবাহিক মব সন্ত্রাস শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতির চিত্র নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায় এড়ানোর বিপজ্জনক নজির। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যথার্থই বলেছেন- এই মব সন্ত্রাস পুরো জাতিকে বিভক্ত করেছে এবং এর দায় সরকারের ওপরই বর্তায়।
একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। অথচ আমরা দেখছি, একের পর এক গণমাধ্যম কার্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং ঐতিহাসিক স্থাপনায় হামলা হচ্ছে; ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ঘটছে - আর রাষ্ট্র যেন নির্বিকার দর্শক। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, উদীচী কিংবা ছায়ানট - এগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয় নয়, এগুলো রাষ্ট্রের বিবেক, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতীক।
মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো- এটি অপরাধকে ব্যক্তির হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ভিড়ের হাতে তুলে দেয়। বিচার ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা তৈরি করে এবং প্রতিশোধপরায়ণতাকে উসকে দেয়। কোনো ঘটনার বিচার হবে আদালতে - এটাই সভ্য রাষ্ট্রের নীতি। কিন্তু যখন রাষ্ট্র সেই নীতির প্রয়োগে ব্যর্থ হয়, তখন উন্মত্ততা জায়গা করে নেয়। যেমনটি আমরা দেখেছি ময়মনসিংহের ভালুকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যুবক দিপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যা এবং তার লাশ পোড়ানোর বর্বর চিত্র।
শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকা-ের বিচার অবশ্যই হতে হবে। একই সঙ্গে তার নাম ব্যবহার করে সংঘটিত প্রতিটি সহিংসতার বিচারও নিশ্চিত করতে হবে। এক অপরাধের প্রতিবাদে আরেক অপরাধ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মব সন্ত্রাসকে ‘আবেগ’ বা ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ বলে দায়মুক্তি দেওয়ার সংস্কৃতি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে- দীর্ঘ সময় ধরে চলমান মব সন্ত্রাস জাতিকে বিভক্ত করছে। সত্যিই, মতভিন্নতা গণতন্ত্রের শক্তি; কিন্তু সহিংসতা তার মৃত্যু ঘণ্টা। সরকারের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল- স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের পর জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা, আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে।
এ মুহূর্তে প্রয়োজন কঠোর কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক পদক্ষেপ। রাজনৈতিক পরিচয়, আদর্শ বা আবেগের অজুহাতে কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে- আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
মব সন্ত্রাস কোনো পক্ষের লাভ বয়ে আনে না; এটি রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে, সমাজকে ক্ষতবিক্ষত করে। এখনই যদি লাগাম না টানা হয়, তবে এই সহিংসতার আগুন একদিন সবার ঘরেই পৌঁছাবে। সরকারকে অনতিবিলম্বে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে - এটাই সময়ের দাবি, এটাই জাতির প্রত্যাশা।