বাংলাদেশে মাদক সমস্যার যে ভয়াবহ চিত্র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করছেন - সংখ্যায় যা প্রায় ৮২ লাখ। এর মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কজনক তথ্য হলো, মাদকাসক্তদের এক-তৃতীয়াংশের বয়স ৭ থেকে ১৭ বছর। অর্থাৎ শিশু ও কিশোর বয়সেই একটি বড় অংশ মাদকের জগতে প্রবেশ করছে, যা জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এরপরেই রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোডিনজাত কাশি সিরাপ। মাদক ব্যবহার শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে।
মাদক গ্রহণের বয়স বিশ্লেষণে আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। প্রায় ৫৯ শতাংশ মানুষ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে এবং ৩৩ শতাংশ মানুষ ১৮ বছরের আগেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। কৈশোরকাল, যে সময়টি শিক্ষা, মূল্যবোধ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ - ঠিক সেই সময়েই তারা ধ্বংসের পথে পা বাড়াচ্ছে। এটি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজব্যবস্থার জন্য একটি বড় ব্যর্থতার ইঙ্গিত।
গবেষণায় চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো- বেকারত্ব, বন্ধুমহলের নেতিবাচক প্রভাব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও মাদকের সহজলভ্যতা - সবকিছু মিলিয়ে একটি গভীর সামাজিক সংকটের প্রতিফলন। যখন প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী বলেন, মাদক সহজেই পাওয়া যায়, তখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
বিশেষজ্ঞরা যথার্থই বলেছেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। শুধু অভিযান বা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ- প্রতিরোধমূলক শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন, এবং সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে আরও সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। তাই রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সামাজিক আন্দোলন এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মাদকের বিরুদ্ধে একটি কার্যকর ‘সামাজিক যুদ্ধ’ গড়ে তুলতে হবে।
আজ যদি আমরা এই ভয়াবহ বাস্ততাকে উপেক্ষা করি, তবে আগামী প্রজন্মকে আমরা একটি অসুস্থ, অনিরাপদ ও সম্ভাবনাহীন সমাজ উপহার দেব। মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে এখনই সর্বস্তরের সম্মিলিত ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।