বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হাওরাঞ্চলের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ আসে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা থেকে। অথচ এই অঞ্চলটি বছরের পর বছর ধরে প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম লড়াই চালিয়ে আসছে। আকস্মিক বন্যা, বৈরী আবহাওয়া ও স্বল্প সময়ের মধ্যে ফসল ঘরে তোলার চাপ - এই তিন সংকটই হাওর কৃষকের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। এমন বাস্তবতায় হাওরাঞ্চলের উপযোগী নতুন জাতের ধান অবমুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী সুখবর।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) উদ্ভাবিত ঠা-া-সহনশীল ও স্বল্প জীবনকালস¤পন্ন ব্রি ধান-১১৮ অবমুক্ত করার মাধ্যমে হাওর কৃষিতে নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে। জাতীয় বীজ বোর্ডের সর্বশেষ সভায় এই জাতসহ আরও পাঁচটি নতুন ধান অবমুক্ত হওয়ায় ব্রির উদ্ভাবিত মোট ধানের জাতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৭-এ, যা দেশের কৃষি গবেষণার সক্ষমতারই প্রতিফলন।
হাওরাঞ্চলের কৃষকের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হলো- ধান পাকতে শুরু করার সময় আকস্মিক বন্যা। এ কারণে অনেক কৃষক আগাম বপনের দিকে ঝুঁকেন। কিন্তু আগাম বপনে প্রজনন পর্যায়ে তাপমাত্রা কমে গিয়ে ধান চিটা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। প্রচলিত বেশির ভাগ বোরো ধানের জীবনকাল ১৪০ থেকে ১৬০ দিন হওয়ায় এই ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ব্রি ধান-১১৮ এই দুই সমস্যারই কার্যকর সমাধান দিতে সক্ষম বলে প্রতীয়মান হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই জাতটির গড় জীবনকাল মাত্র ১৩৬-১৩৭ দিন এবং এটি ঠা-া সহনশীল। এমনকি ২৫ অক্টোবর থেকে ১ নভেম্বরের মধ্যে বপন করেও প্রজনন পর্যায়ে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকা সত্ত্বেও সন্তোষজনক ফলন পাওয়া গেছে। স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনায় হেক্টরপ্রতি গড় ফলন প্রায় ৬.৭৭ টন এবং উন্নত ব্যবস্থাপনায় তা ৮.৫ টন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। চালের গুণগত মানও সন্তোষজনক - ভাত ঝরঝরে, রং সাদা ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ।
এটি শুধু একটি নতুন জাত নয়, বরং হাওরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি কৌশলগত অগ্রগতি। প্রায় ৬৮ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য হাওর জমির অধিকাংশে বোরো ধান চাষ হয়। সেখানে এই জাতের বিস্তৃত চাষ শুরু হলে বন্যাজনিত ক্ষতি কমবে, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং খাদ্য উৎপাদনে স্থিতিশীলতা আসবে।
একই সঙ্গে উচ্চ ফলনশীল নাবি জাত ব্রি ধান-১১৬ অবমুক্ত হওয়ায় বোরো মৌসুমে উৎপাদনের নতুন বিকল্প তৈরি হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা মিলিয়ে পরিকল্পিত উদ্ভাবনই কৃষিকে টেকসই করতে পারে। তবে জাত অবমুক্ত করাই শেষ কথা নয়। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো- পর্যাপ্ত বীজ উৎপাদন, সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা এবং কৃষকদের মাঝে কার্যকরভাবে সম্প্রসারণ কার্যক্রম চালানো। হাওরাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকদের কাছে এই নতুন জাতের সুফল পৌঁছে দিতে কৃষি বিভাগ, বিএডিসি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রি ধান-১১৮ শুধু একটি নতুন ধানের জাত নয় - এটি হাওর কৃষকের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎকে কিছুটা হলেও নিরাপদ করার একটি বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা। এই উদ্যোগ যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে হাওরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, যার সুফল ভোগ করবে পুরো দেশ।