সংসদের শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত ব্যক্তিদের নাম প্রত্যাহার করা উচিত

আপলোড সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ০৫:০২:৫৬ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-০৩-২০২৬ ০৫:০২:৫৬ পূর্বাহ্ন
জাতীয় সংসদ একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনসভা। এই প্রতিষ্ঠান কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি একটি জাতির ইতিহাস, মূল্যবোধ এবং আত্মমর্যাদার প্রতীক। সেই সংসদে যখন একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত ব্যক্তিদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন তা নিছক একটি প্রক্রিয়াগত ভুল নয়, এটি জাতির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং লাখো শহীদের আত্মত্যাগের প্রতি এক গভীর অবমাননা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ন্যায়সংগত মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন, লাখো মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন, অসংখ্য মানুষ নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সেই ভয়াবহ সময়ে যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী হয়ে আলবদর, রাজাকার কিংবা অন্যান্য ঘাতক বাহিনীর সদস্য হিসেবে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অংশ নিয়েছিল, তারা ইতিহাসের বিচারে অপরাধী। রাষ্ট্রের আদালতও তাদের অনেককে দোষী সাব্যস্ত করেছে। সেইসব দ-িত যুদ্ধাপরাধীদের নাম জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা - এটি শুধু একটি অনভিপ্রেত ঘটনা নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে নির্মম পরিহাস। সংসদে শোক প্রস্তাব সাধারণত সেইসব ব্যক্তিদের জন্য গ্রহণ করা হয়, যাদের অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। সেখানে যুদ্ধাপরাধে দ-িত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা মানে শহীদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এটি এমন একটি বার্তা দেয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বিভ্রান্তিকর এবং বিপজ্জনক। এতে মনে হতে পারে, ইতিহাসের অপরাধী ও শহীদ - দুজনকেই একই মর্যাদায় দাঁড় করানো হচ্ছে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় সংসদ সদস্যদের একটি অংশের দাঁড়াতে গড়িমসি করার অভিযোগ। জাতীয় সংগীত কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি সমগ্র জাতির পরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার প্রতীক। সংসদের ভেতরে এই প্রতীকের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন নিঃসন্দেহে অত্যন্ত লজ্জাজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত একজন ব্যক্তিকে সংসদের সভাপতিম-লীর প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সংসদের মর্যাদা রক্ষার জন্য এর নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নাতীত হওয়া জরুরি। অন্যথায় এই প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে নানা সময়েই রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে। বিভিন্ন দল কখনো এটিকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেছে, আবার কখনো নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা বা তার অপরাধীদের পুনর্বাসনের কোনো প্রচেষ্টা জাতির জন্য অশনিসংকেত। সুতরাং জাতীয় সংসদের শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত ব্যক্তিদের নাম অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত। পাশাপাশি জাতীয় সংগীতের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। সংসদের মর্যাদা রক্ষায় এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখাতেই এসব বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আপসের ফল নয়; এটি লাখো মানুষের রক্তে অর্জিত। সেই ইতিহাসকে অসম্মান করার কোনো সুযোগ এই রাষ্ট্রে থাকা উচিত নয়। জাতির আত্মমর্যাদা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রক্ষার প্রশ্নে আপসের কোনো অবকাশ নেই।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com