বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে ::
*তড়িঘড়ি ঘাস লাগিয়ে দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা পিআইসি’র
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বজ্র ও শিলাবৃষ্টি কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে কৃষকের বুকে। অনিয়ম-দুর্নীতির খপ্পরে পড়া দায়সারা বাঁধ বৃষ্টিতে আরও নড়বড়ে হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে এখনও মাটি ফেলার ধামাচাপা কাজ চলমান আছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় বিপর্যস্ত হাওরের করুণ দশা তাড়া করছে একফসলী এলাকার মানুষদের। হাওর এলাকায় এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
২০১৭ সালে অসময়ের পানিতে হাওর তলিয়ে গেলে বেড়িবাঁধ (আফর) মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রথা বাদ দিয়ে নতুন কাবিটা নীতিমালা জারি করলেও লুটেরা প্রবৃত্তি ঠেকাতে পারেনি সরকার। সরজমিনের চিত্র, কৃষক ও সচেতন মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া হাওরের সর্বনাশা তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন নীতিমালায় কৃষকের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প কমিটি ১৫ ডিসেম্বর শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্য-বাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর বর্ধিত সময় পার করেও বাঁধের কাজ না হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন কৃষক। দায়সারা কাজে বরাদ্দ গিলে খাওয়ার আয়োজন শেষ পর্যায়ে পৌঁছলেও গেল কয়দিনের টানা বৃষ্টি গোটা হাওরাঞ্চলকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একাধিক হাওর ঘুরে দেখার পাশাপাশি কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের সাথে কথা বলে ফসলরক্ষা বাঁধের নামে লুটপাটের দৃশ্যমান বাস্তবতা চোখে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরের বিপজ্জনক আলমখালি ক্লোজারে গেলে ওই বাঁধে এখনও মাটি ফেলতে দেখা যায়। এছাড়া একাধিক বাঁধ ঘুরে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। খোদ শ্রমিকসহ বাঁধ তীরবর্তী গ্রামের একাধিক কৃষক এ প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ ঝেরেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা আরও এক মাস আগে- এখন কেন প্রশ্ন রেখে বাঁধের পার্শ্ববর্তী খাউকান্দি-বড়দল গ্রামের মো. ফয়জুন নূর ও মো. রিয়াজসহ একাধিক কৃষক বলেন, গতবারের তুলনায় এবারের কাজ অনেক দুর্বল। আর কয়দিন বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল এক ধাক্কায় সব শেষ করে দিবে। বাঁধের কাজ কে করে কেউ জানে না। জিজ্ঞেস করলে বলে ইউএনও। সব বাঁধের কাজ নিয়ে জালিয়াতি আর জালিয়াতি।
সম্প্রতি ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের সুখাইড়, নোয়াগাঁও, জারাকোনা গ্রামসংলগ্ন কয়েকটি বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, কিছু কিছু বাঁধে বৃষ্টিতে সৃষ্ট ফাটল কিংবা ভাঙন ঢাকতে তড়িঘড়ি দুর্বা লাগিয়ে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ চেষ্টা করছে শ্রমিকেরা। বেশির ভাগ বাঁধে ঘাস না লাগিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে পিআইসির লোকজন।
জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের অন্তত ৩০টি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভারি বৃষ্টিতে কিছু কিছু বাঁধে দুর্বলতা জেঁকে বসেছে। বেশির ভাগ বাঁধে লাগানো হয়নি দুর্বা। অনেক বাঁধে বাকি আছে দুরমুশের কাজ। কোন কোন বাঁধে মাটি ফেলার যেনতেন কাজে সময় অতিক্রান্ত করে বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার দৃশ্যমান বাস্তবতা দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
হালি হাওরের উলুকান্দি-ঝুনুপুর গ্রামের মধ্যস্থলের নেত্তুয়ার কাড়া বাঁধের একাংশ নদীগর্ভে ধসে বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে। ঘনিয়ার বিলসংলগ্ন ১৭ ও ১৮ নম্বর পিআইসিভুক্ত বাঁধের একাংশে ভাঙনের সৃষ্টি হলেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন। বিপরীত পারের শনির হাওর অংশের ২৬ নম্বর প্রকল্পের ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারটি বাঁশ, বস্তা, কার্পেটিং না করায় বৃষ্টিতে ধসে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা উঁকি মারছে। তাহিরপুর উপজেলার সাহেবনগর গ্রামসংলগ্ন শনির হাওরের ৪৩ নম্বর প্রকল্পের বিশাল ক্লোজারটি (বড় ভাঙন) কোনরকম দুরমুশ করে দায় সেরেছে পিআইসি। বৃষ্টিতে বাঁধের কিছু কিছু জায়গায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধের ঝুঁকি এড়াতে নেওয়া হয়নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কোনখানে নেই বাঁধ ঝুঁকিমুক্ত করার উপকরণ। জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় সব বাঁধের চিত্র একই রকম বলে জানিয়েছেন অনেকে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ১২ উপজেলার ৪২টি হাওরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের কাজ হচ্ছে। এবারের প্রাক্কলন ব্যয় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় এ বছর ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। প্রায় ২ লক্ষ কৃষকের আবাদকৃত জমিতে প্রায় ১৪ লক্ষ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি অধিদপ্তর। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এখানকার কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু হাওর, কৃষক ও ফসল রক্ষায় পাউবো ও প্রশাসনের খামখেয়ালিপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
তাহিরপুরের শনি হাওরের ৪৩ নম্বর পিআইসির বাঁধে দাঁড়িয়ে রামজীবনপুর গ্রামের কৃষক মো. পরশমনি বলেন, বেশি বৃষ্টি দিলে এই বাঁধ ভাইঙা (ভেঙে) নদীতে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তাড়াতাড়ি বাঁশের আড়-বস্তা দেওয়া দরকার। বাঁধ ভাঙলে আমরার সবকিছু মাটি হইয়া যাইব। শনির হাওরের ৪৩ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এত বড় ক্লোজারে বরাদ্দ ২২ লাখ। তার লাগা ৪২ নম্বর পিআইসির বরাদ্দ ২০ লাখ টাকা। অপর পারে হালি হাওরের রামজীবনপুর-রাজধরপুরের মাঝে ৪০ ও ৪১ নম্বর পিআইসির একটিতে ৩৩ লাখ ও অন্যটিতে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ২২ লাখ টাকায় বাঁশ-বস্তা-কার্পেট লাগানো সম্ভব কিনা প্রশ্ন রাখেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
একাধিক প্রকল্প ঘুরে হাওর বাঁচাও আন্দোলন জামালগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারগুলোতে মাটির কাজ ছাড়া বাঁধ টেকসইয়ের কোন কাজ হয়নি। ভারি বৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানে বাঁধ ডেবে গিয়ে ফাটল ধরেছে। হাওর ঝুঁকিতে ফেলে সর্বাগ্রে লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছে পাউবোসহ সংশ্লিষ্টরা। এতে ২০১৭ সালের প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
শান্তিগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. আবু সঈদ বলেন, পাউবো ও প্রশাসন কর্তৃক উত্থাপিত কাজের অগ্রগতির সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। বর্ধিত সময়ের পরেও বাঁধে ঘাস লাগানো হচ্ছে। বেশির ভাগ বাঁধেই ঘাস লাগানো হয়নি। বৃষ্টি হওয়ায় বাঁধ আরও দুর্বল হয়েছে। আর কয়দিন টানা বৃষ্টি দিলে ফসলহানির সম্ভাবনা রয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বাঁধে মাটির কাজ শেষ হয়েছে। অনেক বাঁধে বাঁশ-বস্তা ও জিওটেক্স ধরা নেই। বাঁধের নিরাপত্তায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বাকি কাজ করা হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি মুশফিকীন নূর বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে জিওটেক্স ধরা আছে। বরাদ্দকৃত টাকা মন্ত্রণালয় দেরিতে দেওয়ায় পিআইসিরা কাজ করতে পারেনি। জিওটেক্সসহ আনুষাঙ্গিক উপকরণ চলে আসলে দ্রুত কাজ করা হবে।
*তড়িঘড়ি ঘাস লাগিয়ে দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা পিআইসি’র
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে সাম্প্রতিক বজ্র ও শিলাবৃষ্টি কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে কৃষকের বুকে। অনিয়ম-দুর্নীতির খপ্পরে পড়া দায়সারা বাঁধ বৃষ্টিতে আরও নড়বড়ে হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে এখনও মাটি ফেলার ধামাচাপা কাজ চলমান আছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৭ সালের অকাল বন্যায় বিপর্যস্ত হাওরের করুণ দশা তাড়া করছে একফসলী এলাকার মানুষদের। হাওর এলাকায় এ নিয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
২০১৭ সালে অসময়ের পানিতে হাওর তলিয়ে গেলে বেড়িবাঁধ (আফর) মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রথা বাদ দিয়ে নতুন কাবিটা নীতিমালা জারি করলেও লুটেরা প্রবৃত্তি ঠেকাতে পারেনি সরকার। সরজমিনের চিত্র, কৃষক ও সচেতন মহলের তীব্র প্রতিক্রিয়া হাওরের সর্বনাশা তৎপরতার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। নতুন নীতিমালায় কৃষকের সমন্বয়ে গঠিত প্রকল্প কমিটি ১৫ ডিসেম্বর শুরু করে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কাজ শেষ করার বাধ্য-বাধকতা রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর বর্ধিত সময় পার করেও বাঁধের কাজ না হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগছেন কৃষক। দায়সারা কাজে বরাদ্দ গিলে খাওয়ার আয়োজন শেষ পর্যায়ে পৌঁছলেও গেল কয়দিনের টানা বৃষ্টি গোটা হাওরাঞ্চলকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। একাধিক হাওর ঘুরে দেখার পাশাপাশি কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের সাথে কথা বলে ফসলরক্ষা বাঁধের নামে লুটপাটের দৃশ্যমান বাস্তবতা চোখে পড়েছে।
গত মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দুপুরে তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরের বিপজ্জনক আলমখালি ক্লোজারে গেলে ওই বাঁধে এখনও মাটি ফেলতে দেখা যায়। এছাড়া একাধিক বাঁধ ঘুরে পরিস্থিতি বেশ উদ্বেগজনক মনে হয়েছে। খোদ শ্রমিকসহ বাঁধ তীরবর্তী গ্রামের একাধিক কৃষক এ প্রতিবেদকের কাছে ক্ষোভ ঝেরেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধের কাজ শেষ হওয়ার কথা আরও এক মাস আগে- এখন কেন প্রশ্ন রেখে বাঁধের পার্শ্ববর্তী খাউকান্দি-বড়দল গ্রামের মো. ফয়জুন নূর ও মো. রিয়াজসহ একাধিক কৃষক বলেন, গতবারের তুলনায় এবারের কাজ অনেক দুর্বল। আর কয়দিন বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল এক ধাক্কায় সব শেষ করে দিবে। বাঁধের কাজ কে করে কেউ জানে না। জিজ্ঞেস করলে বলে ইউএনও। সব বাঁধের কাজ নিয়ে জালিয়াতি আর জালিয়াতি।
সম্প্রতি ধর্মপাশা উপজেলার সোনামড়ল হাওরের সুখাইড়, নোয়াগাঁও, জারাকোনা গ্রামসংলগ্ন কয়েকটি বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, কিছু কিছু বাঁধে বৃষ্টিতে সৃষ্ট ফাটল কিংবা ভাঙন ঢাকতে তড়িঘড়ি দুর্বা লাগিয়ে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকার’ চেষ্টা করছে শ্রমিকেরা। বেশির ভাগ বাঁধে ঘাস না লাগিয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে পিআইসির লোকজন।
জামালগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলার হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরের অন্তত ৩০টি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভারি বৃষ্টিতে কিছু কিছু বাঁধে দুর্বলতা জেঁকে বসেছে। বেশির ভাগ বাঁধে লাগানো হয়নি দুর্বা। অনেক বাঁধে বাকি আছে দুরমুশের কাজ। কোন কোন বাঁধে মাটি ফেলার যেনতেন কাজে সময় অতিক্রান্ত করে বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার দৃশ্যমান বাস্তবতা দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
হালি হাওরের উলুকান্দি-ঝুনুপুর গ্রামের মধ্যস্থলের নেত্তুয়ার কাড়া বাঁধের একাংশ নদীগর্ভে ধসে বিপজ্জনক অবস্থায় পতিত হয়েছে। ঘনিয়ার বিলসংলগ্ন ১৭ ও ১৮ নম্বর পিআইসিভুক্ত বাঁধের একাংশে ভাঙনের সৃষ্টি হলেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন। বিপরীত পারের শনির হাওর অংশের ২৬ নম্বর প্রকল্পের ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারটি বাঁশ, বস্তা, কার্পেটিং না করায় বৃষ্টিতে ধসে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা উঁকি মারছে। তাহিরপুর উপজেলার সাহেবনগর গ্রামসংলগ্ন শনির হাওরের ৪৩ নম্বর প্রকল্পের বিশাল ক্লোজারটি (বড় ভাঙন) কোনরকম দুরমুশ করে দায় সেরেছে পিআইসি। বৃষ্টিতে বাঁধের কিছু কিছু জায়গায় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। অতি ঝুঁকিপূর্ণ এ বাঁধের ঝুঁকি এড়াতে নেওয়া হয়নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কোনখানে নেই বাঁধ ঝুঁকিমুক্ত করার উপকরণ। জেলার হাওরাঞ্চলের প্রায় সব বাঁধের চিত্র একই রকম বলে জানিয়েছেন অনেকে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, ১২ উপজেলার ৪২টি হাওরে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও মেরামতের কাজ হচ্ছে। এবারের প্রাক্কলন ব্যয় প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা। সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য মতে, জেলায় এ বছর ২ লক্ষ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। প্রায় ২ লক্ষ কৃষকের আবাদকৃত জমিতে প্রায় ১৪ লক্ষ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি অধিদপ্তর। যার বাজার মূল্য প্রায় ৫ হাজার ৫০ কোটি টাকা। দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এখানকার কৃষকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু হাওর, কৃষক ও ফসল রক্ষায় পাউবো ও প্রশাসনের খামখেয়ালিপনা লক্ষ করা যাচ্ছে।
তাহিরপুরের শনি হাওরের ৪৩ নম্বর পিআইসির বাঁধে দাঁড়িয়ে রামজীবনপুর গ্রামের কৃষক মো. পরশমনি বলেন, বেশি বৃষ্টি দিলে এই বাঁধ ভাইঙা (ভেঙে) নদীতে পড়ার সম্ভাবনা আছে। তাড়াতাড়ি বাঁশের আড়-বস্তা দেওয়া দরকার। বাঁধ ভাঙলে আমরার সবকিছু মাটি হইয়া যাইব। শনির হাওরের ৪৩ নম্বর পিআইসির সভাপতি মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, এত বড় ক্লোজারে বরাদ্দ ২২ লাখ। তার লাগা ৪২ নম্বর পিআইসির বরাদ্দ ২০ লাখ টাকা। অপর পারে হালি হাওরের রামজীবনপুর-রাজধরপুরের মাঝে ৪০ ও ৪১ নম্বর পিআইসির একটিতে ৩৩ লাখ ও অন্যটিতে ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ২২ লাখ টাকায় বাঁশ-বস্তা-কার্পেট লাগানো সম্ভব কিনা প্রশ্ন রাখেন এই প্রতিবেদকের কাছে।
একাধিক প্রকল্প ঘুরে হাওর বাঁচাও আন্দোলন জামালগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারগুলোতে মাটির কাজ ছাড়া বাঁধ টেকসইয়ের কোন কাজ হয়নি। ভারি বৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানে বাঁধ ডেবে গিয়ে ফাটল ধরেছে। হাওর ঝুঁকিতে ফেলে সর্বাগ্রে লুকোচুরির আশ্রয় নিয়েছে পাউবোসহ সংশ্লিষ্টরা। এতে ২০১৭ সালের প্রলয়ঙ্করী বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
শান্তিগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. আবু সঈদ বলেন, পাউবো ও প্রশাসন কর্তৃক উত্থাপিত কাজের অগ্রগতির সাথে বাস্তবের কোন মিল নেই। বর্ধিত সময়ের পরেও বাঁধে ঘাস লাগানো হচ্ছে। বেশির ভাগ বাঁধেই ঘাস লাগানো হয়নি। বৃষ্টি হওয়ায় বাঁধ আরও দুর্বল হয়েছে। আর কয়দিন টানা বৃষ্টি দিলে ফসলহানির সম্ভাবনা রয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি মো. মেহেদী হাসান মানিক বলেন, বাঁধে মাটির কাজ শেষ হয়েছে। অনেক বাঁধে বাঁশ-বস্তা ও জিওটেক্স ধরা নেই। বাঁধের নিরাপত্তায় আগামী কয়েকদিনের মধ্যে বাকি কাজ করা হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও কাবিটা মনিটরিং কমিটির সভাপতি মুশফিকীন নূর বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধে জিওটেক্স ধরা আছে। বরাদ্দকৃত টাকা মন্ত্রণালয় দেরিতে দেওয়ায় পিআইসিরা কাজ করতে পারেনি। জিওটেক্সসহ আনুষাঙ্গিক উপকরণ চলে আসলে দ্রুত কাজ করা হবে।