পরিবারে শোকের মাতম

ভূমধ্যসাগরে সুনামগঞ্জের ১২ যুবকের সলিল সমাধি

আপলোড সময় : ৩০-০৩-২০২৬ ০৭:০২:৪৪ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩০-০৩-২০২৬ ০৭:০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন
শহীদনূর আহমেদ::
“আল্লাহ আগো আল্লাহ তুমি আমারে আমার ফুতের ধারে নেউগি। এমন ফুত আমি কই পাইমুগো।” এভাবে গগনবিদারী আর্তনাদ জগন্নাথপুরের ইছগাঁও গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বশির মিয়ার। বুকের ধন মেজো ছেলে আলী আহমদ ইতালি যাওয়ার পথে অনাহার আর রোগাক্রান্ত হয়ে ভূমধ্যসাগরে মারা গেছে। ছেলের মৃত্যুর খবর শোনার পর বশির দম্পতির আহাজারি থামছে না। 
একইভাবে সাগরে সলিল সমাধি হয়েছে এই উপজেলার চিলাউড়া গ্রামের দুবাই ফেরত যুবক নাইম মিয়ার। সন্তানের মৃত্যুর খবরে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন আঁখি বেগম। শেষবারের মতো দেখতে চান নাড়ীছেঁড়া ধনকে। দুই বছরের ফুটফুটে সন্তান ওয়াজিফাকে কোলে নিয়ে আল্লাহ’র কাছে অভিযোগ করছেন নাইমের সদ্য বিধবা স্ত্রী।
দালালের খপ্পরে পড়ে লিবিয়া থেকে ইতালি যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ির দেয়ার সময় অনাহার ও রোগাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী যুবকদের পরিবারে এভাবেই চলছে শোকের মাতম। জানাগেছে, ভূমধ্যসাগরের গ্রীসের উপকূলে অন্তত ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে ১২ জনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। নিহতদের মধ্যে দিরাই উপজেলার ৬ জন, জগন্নাথপুর উপজেলার ৫ ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ১ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতরা হলেন- দিরাই উপজেলার জগদল ইউনিয়নের তারাপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩০), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৮), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দিনের ছেলে মো. সাহান (২৫), রাজানগর ইউনিয়নের জাহানপুর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৩৮), বাউরী গ্রামের মো. সোহানূর রহমান (২৬) ও মাটিয়াপুর গ্রামের মেহেদী হাসান তায়েফ। জগ্ননাথপুর উপজেলার নিহত ৫ জনের মধ্য টিয়ারগাঁও এলাকার শায়েখ আহমদ জয়, ইছগাঁও গ্রামের মো. আলী, পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান ও চিলাউড়া গ্রামের ইজাজুল এবং নাইম মিয়া। এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার অভ্র ফাহিম নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন।
নিহতদের স্বজনরা জানান, মানবপাচারকারী একাধিক চক্র ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ইতালিতে পাঠানোর উদ্দেশ্যে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে যায়। লিবিয়ায় দালালের গেইম ঘরে দীর্ঘদিন আটকে রেখে ২১ মার্চ রাবারের নৌকায় করে ৪৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী নিয়ে সাগর পাড়ি দেয়ার ঝুঁকি নেয়। লিবিয়া থেকে নৌকায় করে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে সাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে অভিবাসনপ্রত্যাশী ২২ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২ যুবক রয়েছেন। অপরদিকে, ১৮ তরুণ অনাহারে মারা যাওয়ার পর তাদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কিশোরগঞ্জের এক যুবক। তার একটি ভিডিও শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ওই কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল কাদির বলে জানাগেছে। ভিডিওতে ওই তরুণকে বলতে শোনা যায়, লিবিয়া থেকে সাগরপথে তারা ৪৩ জন রওনা হয়েছিলেন। তাদের বড় বোটের কথা বলে ছোট হাওয়াই বোটে তুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ওই বোটে পাঁচজন সুদানের নাগরিক ও ৩৮ বাংলাদেশি ছিল। তাদের মধ্যে ১৮ জন মারা গেছেন, যাদের বাড়ি সুনামগঞ্জ-সিলেটে। মারা যাওয়া যুবকদের লাশ দু’দিন বোটে রাখা হয়েছিল। পরে লাশ পচে দুর্গন্ধ বের হওয়ায় সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।
এদিকে, ছয় দিন সাগরে ভাসতে থাকার পর গত ২৭ মার্চ গ্রিসের কোস্টগার্ড ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে। জীবিত ফেরা অভিবাসী দিরাই উপজেলার কুলঞ্জ ইউনিয়নে তারাপাশা গ্রামের রুহান নামের যুবকের কাছ থেকে নিহতদের তথ্য নিশ্চিত করে স্থানীয়দের জানান, তারাপাশা গ্রামের তিনজনসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার অনেকেই মারা যান। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে। তিনি নিজেও গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে রয়েছেন।
অপরদিকে জীবিত ফেরা কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের আব্দুল কাদির নামের ওই যুবকের সাক্ষাৎকার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নিহতদের তথ্য ও ছবি প্রকাশ করেন পরিবারের স্বজনরা। 

অপরদিকে, ৬ মার্চ ভূমধ্যসাগর নৌকায় পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছান হবিগঞ্জের এক যুবক। তাকে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। ২৭ মার্চ উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদেরও একই ক্যাম্পে রেখেছে দেশটির কোস্টগার্ড। গত শনিবার রাতে তার সঙ্গে কথা হয় গণমাধ্যমের। তিনি বলেন, মূলত খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণেই ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা যান। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছিল ছয় দিন। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়। ওই যুবক আরও বলেন, তিনি ক্যাম্পে আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। দু’জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা সুস্থ আছেন। ওই যুবক বলেন, বোটটি পথ হারিয়ে ফেলে। ছয় দিন সাগরে ছিল। এ সময় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটের কারণে অনেকে মারা গেছেন। মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই সুনামগঞ্জের। তবে মৃত মানুষের সঠিক সংখ্যা তাদের জানাতে পারেননি আহত ব্যক্তিরা। মৃত ব্যক্তিদের দুই দিন বোটে রেখে পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। সীমিত খাবার নিয়ে ছোট ছোট বোটে করে লোকজনকে লিবিয়া থেকে গ্রিসে পাঠানো হয়। অপরদিকে, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর ঘটনায় শোকের মাতম চলছে নিহতদের পরিবারে। তারা চান স্বজনের লাশ। পাশাপাশি দালাল চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে পরিবারগুলো।
জগন্নাথপুরের চিলাউড়া গ্রামের নিহত নাইম মিয়ার বাবা দুলন মিয়া বলেন, জায়গা-জমি বিক্রি করে ছেলেরে ইছগাঁওয়ে গ্রামের আদম ব্যবসায়ী আজিজের মাধ্যেমে ১২ লাখ টাকা চুক্তিতে লিবিয়া পাঠিয়েছিলাম। দালাল আমার ছেলের সাথে প্রতারণা করেছে। ১৭ লাখ টাকা দেয়ার পরও সে আমার ছেলেকে অনাহারে রেখেছে। রাবারের নৌকায় করে সাগরে নিয়ে হত্যা করেছে। আমি আমার ছেলের হত্যার বিচার চাই।
চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, ভূমধ্যসাগরে অনাহারে আমার ইউনিয়নের দুই জন যুবক নিহত হয়েছেন। এছাড়াও জগন্নাথপুর ও দিরাই উপজেলায় আরও কয়েকজন যুবক মারা গেছে। দালালের প্রলোভনে তরুণেরা মৃত্যুর প্রতিযোগিতায় নামছে। বিষয়টি সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। দালালদের চিহ্নিত আইনের আওতায় আনতে হবে।
এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার জানান, তারা এখন পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। এর মধ্যে দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুর উপজেলার পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজার উপজেলার একজন আছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, নিহতরা অবৈধ পন্থায় বিদেশ যাওয়ায় আমাদের কাছে এখনো সঠিক তথ্য আসেনি। তবে স্থানীয়ভাবে অনেকের মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করছি। উপজেলা প্রশাসন তথ্য সংগ্রহ করছে। দালালদের তথ্য সংগ্রহ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা জানান তিনি।

এদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, উত্তর আফ্রিকা থেকে ইউরোপে পৌঁছানোর আশায় একটি রাবারের নৌকায় সমুদ্রে ভাসছিলেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। তবে ছয় দিন ভেসে থাকার পর গ্রিসের উপকূলে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায় নৌযানটি। এতে নৌকায় অভুক্ত থাকা ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা গ্রিসের কোস্টগার্ডকে এ তথ্য জানায়। জীবিত উদ্ধার হওয়ার ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ বাংলাদেশি রয়েছে।
শুক্রবার গভীর রাতে গ্রিসের কোস্টগার্ড জানায়, ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী, এক শিশুসহ ২৬ জনকে উদ্ধার করেছে। জাহাজটি দক্ষিণ ক্রিটের শহর ইয়েরাপেত্রা থেকে ৫৩ নটিক্যাল মাইল দক্ষিণে ছিল। কোস্টগার্ড এএফপিকে জানায়, ২১ বাংলাদেশি, ৪ দক্ষিণ সুদানি এবং একজন চাদের নাগরিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, জাহাজে থাকা মানব পাচারকারীদের একজনের নির্দেশে মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, বেঁচে যাওয়া দুজনকে ক্রিটের হেরাকলিয়নের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের বিবৃতির ভিত্তিতে কোস্টগার্ড জানিয়েছে, নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার বন্দর শহর তোবরুক থেকে গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল। এ ঘটনায় গ্রিস কর্তৃপক্ষ দুই দক্ষিণ সুদানি যুবককে গ্রেপ্তার করেছে, যাদের পাচারকারী বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com