স্টাফ রিপোর্টার ::
বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ধান উৎপাদনের জন্য সুপরিচিত হলেও প্রতি বছরই কৃষকদের মোকাবিলা করতে হয় নানা প্রাকৃতিক ঝুঁকির। আগাম বন্যা, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় ধান পুরোপুরি পাকার আগেই তলিয়ে গিয়ে নষ্ট হয়। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ে। এ বাস্তবতা বিবেচনায় বন্যা সহনশীল, স্বল্প জীবনকালীন ও উচ্চফলনশীল ধানের চাষ সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘এসেড হবিগঞ্জ’ জাপানের শেয়ারদ্যা প্ল্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন ও জাপান ফান্ড ফর গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘এনরিচ’ প্রকল্পের আওতায় শান্তিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে উন্নত জাতের ধানের প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে।
প্রকল্পের আওতায় পূর্ব পাগলা ও পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ৮ জন কৃষকের ৮টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি প্লটের আয়তন প্রায় ১ বিঘা। এসব জমিতে বন্যা সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল ধানের জাত- ব্রি ধান-৬৭, ব্রি ধান-৯২ ও ব্রি ধান-১০৮ চাষ করা হচ্ছে।
প্রদর্শনী প্লটে অংশ নেওয়া কৃষকদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদপুর গ্রামের ছাদিক মিয়া, আমরতলী গ্রামের বেনু রঞ্জন দাস, পিঠাপই গ্রামের মতিউর রহমান, খুরিয়াই গ্রামের আব্দুস সবুর, শত্রুমর্দন গ্রামের মনীন্দ্র সূত্রধর, ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের জাবেদ নূর, হাসনপুর গ্রামের আবু মিয়া এবং নিদনপুর গ্রামের রাশেদ আলী।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব প্রদর্শনী প্লট শুধু চাষাবাদ নয়, কৃষকদের জন্য একটি বাস্তব প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করছে। প্লট স্থাপনের আগে কৃষকদের জমি প্রস্তুতকরণ, উন্নত বীজ নির্বাচন, চারা উৎপাদন, সুষম সার প্রয়োগ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মাঠকর্মীরা নিয়মিত প্লট পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করছেন।
ব্রি ধান-৬৭ সাধারণত ১৪৫-১৫০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব হয়, যা আগাম বন্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। ব্রি ধান-৯২ উচ্চফলনশীল জাত, যার জীবনকাল ১৫৬-১৬০ দিন এবং প্রতিকূল পরিবেশেও ভালো ফলন দেয়। অন্যদিকে ব্রি ধান-১০৮-এর জীবনকাল প্রায় ১৪৯-১৫১ দিন; গাছ শক্ত হওয়ায় সহজে লজিং হয় না এবং রোগবালাইয়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম।
প্রদর্শনী প্লট দেখে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই নিয়মিত এসব প্লট পরিদর্শন করে নতুন জাতের ধান চাষে উৎসাহিত হচ্ছেন।
কৃষক মতিউর রহমান বলেন, আগে প্রচলিত জাতের ধান চাষ করতাম, যা অনেক সময় বন্যায় নষ্ট হয়ে যেত। এখন নতুন জাত চাষ করে সময়মতো ধান কাটতে পারব বলে আশা করছি।
ছাদিক মিয়া জানান, প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে ধান চাষ শিখেছি। সঠিক সময়ে চারা রোপণ ও সার ব্যবস্থাপনায় গাছ ভালো বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও বেশি জমিতে এ ধরনের ধান চাষ করব।
এসেড হবিগঞ্জের প্রকল্প কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ও বন্যা সহনশীল ধান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনরিচ প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের শুধু বীজ নয়, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, এসব প্রদর্শনী প্লট পুরো এলাকার কৃষকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। আগামী মৌসুমে আরও বেশি কৃষক এই জাতের ধান চাষে আগ্রহী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই কৃষকদের অভিযোজন সক্ষমতা বাড়াতে উন্নত ও সহনশীল ধানের জাতের ব্যবহার এখন সময়ের দাবি। এনরিচ প্রকল্পের এই উদ্যোগ সেই অভিযোজন প্রচেষ্টার একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।