ভূমধ্যসাগর আবারও হয়ে উঠল মৃত্যুর মিছিলের সাক্ষী। জীবিকার সন্ধানে, স্বপ্নের ইউরোপে পা রাখার আশায় জীবন বাজি রাখা যুবকদের করুণ পরিণতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। সুনামগঞ্জের ১২ যুবকসহ অন্তত ২২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর অনাহার, তৃষ্ণা ও রোগে মৃত্যুর খবর কেবল একটি দুর্ঘটনা নয় -এটি আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। এই মৃত্যুগুলো কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এগুলো সংগঠিত অপরাধের ফল। মানবপাচারকারী দালালচক্র দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলে, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে তরুণদের অবৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা করে আসছে। ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে “স্বপ্নের ইতালি” দেখিয়ে তাদের লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে বন্দি করে রাখা, পরে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায় তুলে দেওয়া - এ এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো- এই তরুণদের কয়েকদিন ধরে না খেয়ে, পানির অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরতে হয়েছে। এমনকি মৃত্যুর পর তাদের লাশও সম্মানের সঙ্গে দাফন হয়নি; পচে যাওয়ার কারণে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, মানবতার চরম অপমান। প্রশ্ন উঠছে - এই দায় কার? আমরা প্রথমত চাই- দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যারা এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। শুধুমাত্র গ্রেপ্তার নয়, তাদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কও ধ্বংস করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসন পর্যন্ত সবাইকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দালালরা প্রকাশ্যেই কাজ করে, কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে তারা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তৃতীয়ত, নিরাপদ অভিবাসনের বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তরুণদের বুঝাতে হবে- অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ প্রতারণার ফাঁদে না পড়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্যোগ প্রয়োজন। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের এই ঝুঁকিপূর্ণ রুট দীর্ঘদিন ধরেই মানবিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে এই রুটে নজরদারি ও উদ্ধার তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। সবশেষে, নিহতদের পরিবারের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। তাদের কান্না শুধু ব্যক্তিগত শোক নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য এক কঠিন প্রশ্ন-কত প্রাণ হারালে আমরা জাগ্রত হব? এই মৃত্যুগুলো যেন আর পরিসংখ্যান না হয়ে ওঠে। এখনই সময় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার, নইলে “স্বপ্নের ইউরোপ” নামের এই মরীচিকা আরও অনেক তরুণের জীবন কেড়ে নেবে।