যুদ্ধ, জ্বালানি, বাজার - ত্রিমুখী চাপ থেকে উত্তরণের উপায়

আপলোড সময় : ০২-০৪-২০২৬ ১০:০০:২৭ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৪-২০২৬ ১০:০০:২৭ পূর্বাহ্ন
শুভ কিবরিয়া:: ইরানে আমেরিকা ও ইসরায়েলের আক্রমণ আপাতদৃষ্টিতে দূরের কোনো আন্তর্জাতিক ঘটনা মনে হলেও, বাংলাদেশের জন্য এটি এক গভীর সংকটের সংকেত। বৈশ্বিক বাণিজ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে হরমুজ প্রণালির সামান্য অস্থিরতাও আমাদের রান্নাঘর থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েন এবং প্রবাসী আয়ের অনিশ্চয়তা - এই ত্রিমুখী চাপ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক আচানক বহিরাগত ধাক্কার সামনে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশ সীমিতভাবে হলেও বৈশ্বিক বাণিজ্য ও রাজনৈতিক চক্রের অংশীজন। গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নের পরিসরেই বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা বড় অংশ যুক্ত। ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েলের যুদ্ধ কিংবা এর ফলে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তাই বাংলাদেশের জন্য কোনো বিচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক ঘটনা নয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি জ্বালানি আমদানির ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। বিশেষ করে তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষেত্রে, এমনকি বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ক্রমশ আমদানিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্তর দ্রুত অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে তার প্রত্যক্ষ অভিঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় আকারে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বড় ঝুঁকিগুলো হলো- জ্বালানি আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যয়-চাপের বিকাশ ও প্রসার। এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে। সংকটের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি মূল্য ও অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন, শিল্প কার্যক্রম, সেচ ও সার উৎপাদন - এসব খাতে ব্যাপক ব্যয়বৃদ্ধি ঘটতে পারে। এর ফলে অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ব্যয়-প্রণোদিত মূল্যস্ফীতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা খাদ্য, পরিবহন, নির্মাণসামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে দ্রুত নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি কৃষি খাত, যা অন্তত প্রথম দৃষ্টিতে বৈশ্বিক ধাক্কা থেকে তুলনামূলকভাবে সুরক্ষিত বলে মনে হতে পারে, সেটিও উৎপাদন উপকরণের উচ্চমূল্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হওয়ার কারণে পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ অবস্থায় সরকারকে কঠিন নীতিগত সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হতে হবে। জ্বালানি ভর্তুকি বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়, অথবা উচ্চ মূল্যে জ্বালানি আমদানি করতে হতে পারে। বিশেষ করে বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির স্পট মূল্য অতিমাত্রায় বেড়ে গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি, লোডশেডিং এবং শিল্প উৎপাদনে বিঘœ ঘটার ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যেতে পারে। স্বল্পমেয়াদে এসব সংকট আমাদের রাজনীতি ও সামাজিক জীবনকেও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। মধ্যমেয়াদে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের উৎপাদন কাঠামো, রপ্তানি সক্ষমতা ও বৈদেশিক খাতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। জ্বালানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ বৃদ্ধি পেলে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, ইস্পাত, সিমেন্ট ও রাসায়নিক শিল্পের মতো জ্বালানি-নির্ভর খাতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে অনিশ্চয়তা, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ চেইনে বিঘেœর কারণে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই বিলম্ব ও ব্যয়চাপ সৃষ্টি হবে। এতে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে যেসব রপ্তানিমুখী শিল্প বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেলে ডলারের চাহিদা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিময় হার এবং সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমানসহ উপসাগরীয় অর্থনীতিতে কর্মরত। যুদ্ধের কারণে এসব দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- মন্থর হলে, অবকাঠামো বিনিয়োগ কমে গেলে কিংবা শ্রমবাজার সংকুচিত হলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ দারুণভাবে কমে যেতে পারে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হবার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফলে এ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ে নেতিবাচকতা সৃষ্টি ও শ্রমবাজারের ঝুঁকি। রেমিট্যান্স কেবল বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, পারিবারিক ভোগব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রেমিট্যান্সে স্থবিরতা বা পতন অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল করে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দেয়। ফলে এই ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিসহ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও বাণিজ্য অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও উন্নয়ন কৌশলের জন্য মৌলিক কিছু নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই সংকট স্পষ্ট করে দেয় যে, কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই চলবে না; প্রয়োজন টেকসই ব্যবস্থাপনা। প্রয়োজন আমদানিনির্ভর নীতিকৌশলকে না বাড়িয়ে জাতীয় সক্ষমতা তৈরির নীতিকৌশলের পথে হাঁটার রাস্তা তৈরি করা। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি হ্রাস অপরিহার্য। সে কারণেই এমন নীতিকৌশল গ্রহণ করতে হবে যা রপ্তানি বহুমুখীকরণকে উৎসাহিত করবে এবং লজিস্টিকস অবকাঠামো শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। জীবাশ্ম জ্বালানির শক্তিশালী বাণিজ্যিক লবিকে অগ্রাহ্য করে সাশ্রয়ী মূল্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ ও শিল্পখাতে জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধির নীতিকৌশলের প্রতিও গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কৌশলগত বৈচিত্র্য আনার ব্যবস্থা নিতে হবে বৈদেশিক শ্রমবাজারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে নমনীয়তা, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় দূরদর্শিতা এবং সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে করে বহিরাগত অযাচিত যেকোনো ধাক্কা বা সংকটে রাষ্ট্র দ্রুত ও কার্যকরভাবে সাড়া দিতে পারে। সার্বিকভাবে, ইরান যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য নিছক একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সংকট নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স, শিল্পায়ন ও প্রবৃদ্ধির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি। এর প্রভাব স্বল্পমেয়াদে মূল্য ও সরবরাহের ধাক্কা হিসেবে, মধ্যমেয়াদে শিল্প ও বৈদেশিক খাতের চাপ হিসেবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন কাঠামোর ভঙ্গুরতা হিসেবে প্রকাশ পায়। তাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী আলোচনায় এই সংকটকে শুধু তাৎক্ষণিক বাজার প্রতিক্রিয়ার দৃষ্টিতে না দেখে বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল পুনর্বিবেচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। সেই সঙ্গে একে জাতীয় সক্ষমতা তৈরির রক্ষণশীল নীতি হিসেবেও দেখা উচিত। এই বহিরাগত ধাক্কা একদিকে যেমন সংকট তৈরি করছে, তেমনি কিছু সম্ভাবনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। কেননা, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজন, অন্যদিকে রয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা, পরিবেশগত স্থায়িত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংস্কার এখন কেবল একটি নীতিগত বিষয় নয়; এটি একটি জাতীয় অগ্রাধিকারের প্রশ্ন। দরকার হচ্ছে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা - যেখানে জ্বালানি স¤পদ ব্যবস্থাপনা জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে। সুতরাং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালীকরণ এবং জ্বালানি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। আজকের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের দিনে তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নে জাতীয় সক্ষমতার বিষয়টি খুবই তাৎপর্যবহ। অন্যদিকে জ্বালানি সুবিচার ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই যদি নিজেদের স¤পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, দুর্নীতি-অর্থপাচার-ব্যাংকলুট বন্ধ করা যায়, দেশের স্বার্থবিরোধী সকল চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা সম্ভব হয়, এবং জাতীয় স্বার্থবিরোধী অর্থনৈতিক কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ী-আমলা-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়িত চক্রকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা যায় - তবে এই সংকট দেশের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দিতে পারে। নবনির্বাচিত সরকারের জন্য এই সংকট এক অর্থে যেমন ব্যবস্থাপনা ও সু শাসনের প্রশ্ন, তেমনি সুবিচার নিশ্চিত করারও প্রশ্ন। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত এই সরকার যদি দলীয় বৃত্ত থেকে উত্তরিত হয়ে জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তবে জাতীয় সক্ষমতা তৈরির নীতিগত অবস্থান নেবার সাহস দেখাতে পারে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ - এই জাতীয় সক্ষমতার নীতিকাঠামো বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সুবিচার যেমন নিশ্চিত হতে পারে, তেমনি সামাজিক ন্যায়বিচারও আলোর মুখ দেখতে পারে। ভূ-রাজনৈতিক এই সংকটের দিনে সেটাই বাংলাদেশকে পথ দেখাতে পারে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com