ফলন বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা কৃষকের

দায়সারা বাঁধে ফসলহানির শঙ্কা

আপলোড সময় : ০৬-০৪-২০২৬ ০১:১১:৫৮ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ০৬-০৪-২০২৬ ০১:১৫:৫৯ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায় ::
সুনামগঞ্জে প্রায় দেড়’শ কোটি টাকার ফসলরক্ষা বাঁধ এখন ফসলহানির বাঁধে পরিণত হয়েছে। রেগুলেটরহীন অপরিকল্পিত বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের পাশাপাশি শত শত মেশিন লাগিয়ে শেষ সম্বল রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষক। এ নিয়ে কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতারা সোচ্চার থাকলেও অনেকটা গাছাড়া ভাব সংশ্লিষ্টদের। যে কারণে কোন কোন হাওর এলাকায় প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে বাঁধ কেটে আইন লঙ্ঘনের ঘটনাও ঘটছে।
কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের সাথে কথা বলে জানাযায়, জেলার প্রায় ৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি বোরো জমি জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের কোন তথ্য না থাকলেও আক্রান্ত জমির পরিমাণ মাত্র ১২শ’ হেক্টর বলছে কৃষি অধিদপ্তর। বিষয়টি হাস্যকর বলছেন হাওর আন্দোলনের নেতারা। ফলন রক্ষায় বুকভরা কষ্ট চেপে কৃষক জেলার অন্তত ৩০ জায়গার বাঁধ কেটে দিয়েছে। কোথাও নিজস্ব খরচে সেচযন্ত্র লাগিয়ে ক্ষেতের আধাপাকা ধান বাঁচানোর মরণপণ চেষ্টা করছেন তারা। একফসলী সম্বল বাঁচাতে শুক্রবার দেখার হাওরের কাড়াড়াই গ্রামসংলগ্ন বাঁধ ও পুটিয়া নদীর ক্লোজারসহ দুইটি বাঁধ কেটে দিয়েছে স্থানীয় কৃষক। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে স্থানীয় প্রশাসনসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাছাড়া ভাবের কারণে হতাশাগ্রস্ত হাজার হাজার কৃষক শান্তিগঞ্জের পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের কাড়াড়াই গ্রামের কৃষক আলতাফ হোসেন ও ছুনু মিয়া বলেন, দেখার হাওরে ডুবরার পানি (ডুবে যাওয়া অবস্থা) জমে আমাদের শেষ সম্বল প্রায় নষ্ট হওয়ার পথে। আমরা প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে নিজেদের খরচে বাঁধ কেটে দিয়েছে। দ্রুত পানি বের হচ্ছে। পানি সরে গেলে ফলন হয়তো কিছুটা রক্ষা পাবে।
জামালগঞ্জের হালি হাওর পারের মোমিনপুর গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া বলেন, ইনছানপুর, ঝুনুপুর, কাজিরগাঁও, মোমিনপুর অংশে প্রায় হাজার একর জমি পানিতে তলানো অবস্থায় আছে। ফসল রক্ষায় কয়েকদিন ধরে ২৫টি শেলু মেশিনে দিনরাত পানি সেচ করা হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন ৭-৮ জন করে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আমাদের মসজিদ-মন্দিরের ফান্ড থেকে এই খরচ করা হচ্ছে। আমরা প্রশাসন থেকে কোন ধরনের সহযোগিতা পাইনি। তবে শুক্রবার এমপি সাহেব সরজমিনে এসে ডিজেল কেনার জন্য ৫০ হাজার টাকা অনুদান দিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। এদিকে, শনিবার সকালে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ডাকুয়ার হাওরের বাঁধ কাটা নিয়ে সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। হাওর তলিয়ে যাওয়ার উদ্বেগ সামলাতে না পেরে সংঘর্ষে জড়ায় স্থানীয় কৃষক। প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে নোয়াগাঁও, গোরেরগাঁও, কান্দাগাঁও, উলুতুলু গ্রামের শতাধিক সশস্ত্র লোকজন বাঁধ কেটে দেয়। একপর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে ওই এলাকায়।সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, জেলার প্রায় ৫৩টি হাওরে এ বছর ৭০২টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) হয়েছে। ৫৮৫কিলোমিটার বাঁধের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৪৫ কোটি টাকা। কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, ছোট-বড় ৯৫টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১০ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছে। এ থেকে ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। 
বাংলাদেশ কৃষক সংগ্রাম সমিতি সুনামগঞ্জের সহ সভাপতি খায়রুল বশর ঠাকুর খান বলেন, একদিকে নীচু জমি তলিয়েছে। অন্যদিকে, পানি থাকায় মেশিনে ধান কাটা যাবে না। উভয় সঙ্কটে হাওরবাসী। সঙ্কট মোকাবেলায় বাঁধ কাটা হচ্ছে। আবার মেশিন লাগিয়ে পানি সেচের মরণপণ চেষ্টা চালাচ্ছেন কৃষকেরা। অপরিকল্পিত বাঁধ ও যথাস্থানে জলকপাট না থাকাটাই কৃষকের শ্রম-ঘামের কষ্টটাকে আরও ভারি করেছে।সুনামগঞ্জ জেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি মো. ইয়াকুব বখত বাহলুল বলেন, পাহাড়ী ঢল আসেনি, তারপরও বৃষ্টির পানি জমে ডুবরায় নীচু জমি তলিয়ে গেছে। নিষ্কাশনের কোন ব্যবস্থা নেই। অনেক জায়গায় কৃষক নিজেরাই উদ্যোগী হয়েছে। বাঁধ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোন পরিকল্পনা নেই। পানি নিষ্কাশনের সুনির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে স্লুইচ গেইট (জলকপাট) নির্মাণ করতে হবে। না হলে কৃষক প্রতি বছররই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।**** শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি হয়েছে। কৃষকের ফলন রক্ষায় আমরা সব ধরনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছি। যেখানে যা করার দরকার আমরা আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করছি।**** শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, কৃষক ও জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে যেদিকে পানি নিষ্কাশনের সুযোগ আছে সেদিকে বাঁধ কেটে দিয়েছি। এখানকার ৪টি অংশে বাঁধ কাটা হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক বিষয়টি দেখভালো করছি।***** সুনামগঞ্জ কৃষি অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক জানিয়েছেন, বিভিন্ন হাওরে ১ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমি পানিতে আক্রান্ত হয়েছে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত না। জলাবদ্ধতায় কতজন কৃষক আক্রান্ত হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি জানা যাবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, ১০টি হাওরের ২৬টি পয়েন্টে এ পর্যন্ত বাঁধ কাটা হয়েছে। কিছু কিছু জায়গায় কৃষক নিজেদের উদ্যোগে বাঁধ কেটেছে। আবার কিছু জায়গায় আমাদের কমিটির উদ্যোগে বাঁধ কাটা হয়েছে। আগামী ৭ তারিখের পর ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায় দ্রুত বাঁধ বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com