স্টাফ রিপোর্টার ::
দলের দুঃসময়ের যখন অনেকেই সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তখন রাজপথে অটল ছিলেন তিনি। মিছিলের সামনে, আন্দোলনের অগ্রভাগে, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে যিনি দলের নেতাকর্মীদের আগলে রেখেছেন বছরের পর বছর - সেই হাফেজা ফেরদৌস লিপনকে এবার মূল্যায়নের জোর দাবি উঠেছে বিএনপি’র তৃণমূলের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচনে বিএনপি’র আরেক নেত্রী সালমা আক্তারের নামও আলোচনায় উঠে এসেছে। সালমা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি’র রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য এবং তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত নজির হোসেনের সহধর্মিণী। পেশাগত জীবনে তিনি ব্যাংক কর্মকর্তা ছিলেন। সালমা আক্তার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকা-ে ভূমিকা রেখে আসছেন।
এদিকে, সংরক্ষিত আসনে নারী সংসদ সদস্য নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন হিসাব-নিকাশ আর সমীকরণ চলছে, তখন সুনামগঞ্জের তৃণমূল নেতাকর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন এক ভিন্ন বাস্তবতা- ত্যাগ, সংগ্রাম আর নিষ্ঠার রাজনীতি। তাদের ভাষায়, “যে নেত্রী দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাকেই এবার সামনে দেখতে চাই।”
বছরের পর বছর রাজপথের ধুলো মেখে, মামলা-হামলা, দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে সংগঠনকে ধরে রেখেছেন হাফেজা ফেরদৌস লিপন। দলের কঠিন সময়গুলোতে তার নেতৃত্বেই রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বিএনপি’র নারী কর্মীরা। তাই সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন প্রসঙ্গে এখন আবেগই যেন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় দাবি।
জেলা মহিলা দলের দপ্তর সম্পাদক আফসা জেবিন বলেন, যখন ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের ভয় ছিল, আতঙ্ক ছিল - তখন লিপন আপাই আমাদের সাহস দিয়েছেন। আজ যদি তার মূল্যায়ন না হয়, তাহলে ত্যাগের রাজনীতি নিরুৎসাহিত হবে।
অ্যাডভোকেট হাফেজা ফেরদৌস লিপনের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৮৮ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্রদলের ছাত্রী বিষয়ক স¤পাদক হিসেবে। এরপর ১৯৯০ সালে জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ১৯৯১ সালে সহ-সভাপতি হন। পরবর্তীতে ২০১২ ও ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির কমিটিতে মহিলা বিষয়ক স¤পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ ও ২০২২ সালে টানা দুই মেয়াদে সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ স¤পাদক ছিলেন। বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য। পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও অবদান রেখে চলেছেন এই নেত্রী। সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতনের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
জেলা মহিলা দলের একাধিক নেত্রী বলেন, লিপন আপা কোনো হঠাৎ উঠে আসা নেত্রী নন। দলের দুর্দিনে তার নেতৃত্বেই আমরা রাজপথে ছিলাম। যখন অনেকেই ভয় পেয়েছে, তখন তিনি আমাদের সংগঠিত রেখেছেন। তার ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
জেলা মহিলা দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খাদিজা কলি বলেন, হাফেজা ফেরদৌস লিপনের রাজনৈতিক পথচলার পেছনে রয়েছে একটি সংগ্রামী পারিবারিক ইতিহাস। তার বড়ভাই মরহুম মাহবুব হোসেইন জাহিদ ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে স¤পৃক্ত থেকে সুনামগঞ্জ জেলা যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। ছোটভাই মুনাজ্জির হোসেন সুজন দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রদল ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একাধিকবার কারাবরণ ও রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েও তিনি বর্তমানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন। তার আরেক ছোটভাই মিজানুর রহমান মনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে রাজনৈতিক নির্যাতনের কারণে দেশান্তর হলে সেখান থেকেও বিএনপির কর্মকা-ের সাথে যুক্ত রয়েছেন।
নিজেও সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট হাফেজা ফেরদৌস লিপন। তিনি বলেন, দলের দুর্দিনে কখনো পিছু হটিনি। দল যেখানেই দায়িত্ব দিয়েছে, সেখানেই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছি। দলের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করেছি। আমি দেশ এবং জনগণের জন্য কাজ করতে চাই। এবার মনোনয়ন চাইবো। আশা করি আমাদের নেতা তারেক রহমান আমাকে বিবেচনা করবেন।
এদিকে, জেলা বিএনপির নেতারাও সুনামগঞ্জের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথা তুলে ধরেছেন। তাদের মতে, বড় জেলা হয়েও সংরক্ষিত নারী আসনে প্রতিনিধিত্ব না পাওয়া দুঃখজনক। তাই এবার এই জেলাকে প্রাধান্য দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুনামগঞ্জ জেলাবাসী বিএনপিকে বিপুল সমর্থন দিয়েছে। যার ফলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জেলার ৫টি আসনেই বিএনপি’র প্রার্থীরা বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। কিন্তু এখান থেকে কেউ মন্ত্রীও হয়নি। তাই সংরক্ষিত নারী আসন এবার সুনামগঞ্জ জেলার প্রাপ্য। তারা বলেন, সংরক্ষিত নারী আসনের এই নির্বাচন শুধু আসন বণ্টনের হিসাব নয় - এটি দলের প্রতি ত্যাগ ও আনুগত্যের স্বীকৃতির একটি বড় সুযোগ। আর সেই সুযোগে তৃণমূলের একটাই প্রত্যাশা- সংগ্রামের রাজপথে পরীক্ষিত নেত্রীকে যেন দেওয়া হয় প্রাপ্য সম্মান।
সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান নাঈম বলেন, দীর্ঘদিন রাজপথে যারা ছিলেন, তাদের উপেক্ষা করা হলে তৃণমূলের মাঝে হতাশা তৈরি হতে পারে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি একাধিকবার সরকার গঠন করলেও সুনামগঞ্জ থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে কেউ এমপি হননি। এবার সেই বঞ্চনা দূর হওয়া উচিত।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, আসন বণ্টনে বিএনপি জোট পাবে ৩৬টি, জামায়াতে ইসলাম জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা একটি আসন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ২১ এপ্রিল। রিটার্নিং কর্মকর্তা দ্বারা যাচাই-বাছাই ২২ এপ্রিল থেকে ২৩ এপ্রিল। বাছাইয়ের বিরুদ্ধে আপিল ২৬ এপ্রিল। আপিল নি®পত্তি ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ২৯ এপ্রিল। প্রতীক বরাদ্দ ৩০ এপ্রিল আর ভোটগ্রহণ ১২ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা।