বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা - সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য যে সরকার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত - তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এই প্রস্তুতির বাস্তব প্রতিফলনই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
অর্থমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি আমদানি নির্ভর হওয়ায় বৈশ্বিক বাজারের অভিঘাত থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব নয়। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও এলএনজির মূল্য বৃদ্ধি দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা যেমন বাজেট ঘাটতি বাড়াবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ ফেলবে। এই দ্বিমুখী সংকট মোকাবিলায় সরকারের কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।
এক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো- সরকার জনগণের ওপর তাৎক্ষণিক মূল্যবৃদ্ধির চাপ না দিয়ে পূর্বের মূল্য বহাল রেখেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি টেকসই হবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। কারণ ভর্তুকিনির্ভর অর্থনীতি কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়; বরং এটি অর্থনীতির ভেতরে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।
সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য- “টেকসই, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি” নিশ্চয়ই সময়োপযোগী। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, সুশাসন এবং কার্যকর বাস্তবায়ন। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, অপচয় কমানো, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎসের সন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
এছাড়া বৈদেশিক শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কৃষি ও শিল্পখাতে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নও অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যাতে সমাজের সকল স্তরে পৌঁছে - সেটিই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
অর্থমন্ত্রী অতীতের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার কথা স্মরণ করিয়ে ভবিষ্যতের পথরেখা তুলে ধরেছেন। কিন্তু ইতিহাসের গৌরব ধরে রাখতে হলে বর্তমানের সংকট মোকাবিলায় আরও বেশি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি তাদের সহনশীলতারও একটি সীমা রয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘোষণা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও কার্যকর ফলাফল। সরকার যদি সত্যিই একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, তবে এখনই সময় সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং সুশাসনের মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি করার। এক্ষেত্রে এই সংকটই হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দ্বার, যদি তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়।