বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি মোকাবেলা

অপ্রয়োজনীয় স্থানে বজ্র নিরোধক দন্ড স্থাপন, কাজে আসেনি তালগাছ প্রকল্পও

আপলোড সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ১১:১৮:০২ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ১১:২৩:০৪ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায় ::
গত ১৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জে পৃথক বজ্রপাতে ৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে সরকার বিগত এক দশকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২৪টি বজ্র নিরোধক দন্ড- (লাইটনিং এরেস্টার) স্থাপনসহ তালগাছ রোপণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সরকারের এসব কার্যক্রম বজ্রপাত নিরোধে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি দাবি স্থানীয়দের।
পরিবেশ কর্মী ও স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, ত্রুটিপূর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় স্থানে বজ্রপাত নিরোধক দন্ড- স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া বজ্রপাত রোধে দন্ড গুলো কতটুকু কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পেরেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীলরা বজ্র নিরোধক দন্ডের কার্যকারিতা নিয়ে একেকজন একেক রকম তথ্য দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জে বোরো ধান কাটার মৌসুম শুরু হলে হাওরবাসীর মাঝে বজ্র আতঙ্ক দেখা দেয়। সরকারি হিসাব মতে, গত পাঁচ বছরে এ পর্যন্ত ৬৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালে ৬ জন, ২০২৩ সালে ২৯, ২০২৪ সালে ১১ জন, ২০২৫ সালে ১৫ জন ও ২০২৬ সালের বুধবার পর্যন্ত ৭ জন মারা গেছেন। বেসরকারি হিসেবে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি।
হাওর এলাকায় মার্চ, এপ্রিল ও মে এই তিন মাস কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে প্রচন্ড- বজ্রপাত হয়। এ সময়কালে বোরো ফলন ঘরে তুলাসহ আনুষাঙ্গিক কাজে হাওরে ব্যস্ত থাকেন অধিকাংশ মানুষ। তখন আকস্মিক বজ্রপাতে হাওরে মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এতে কৃষক ও জেলে পরিবারের লোকজন সবচেয়ে বেশি হতাহতের শিকার হয়। বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সরকার কোটি টাকায় তাল গাছ রোপণ কার্যক্রম থেকে শুরু করে বজ্র নিরোধক দন্ড- স্থাপন করলেও কার্যত কোন ফল পায়নি হাওরাঞ্চলের মানুষ।
সুনামগঞ্জ ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জেলার ছয় উপজেলায় ১৮টি দন্ড স্থাপন করে ‘ক্রিয়েটিভ সোলার অ্যান্ড টেকনোলজি’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৪টি, জামালগঞ্জে ৩টি, তাহিরপুরে ৩টি, বিশ্বম্ভরপুরে ৩টি, ধর্মপাশায় ৩টি এবং শাল্লা উপজেলায় ২টি বজ্র নিরোধক দন্ড- রয়েছে।

১ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে দন্ড-গুলো স্থাপন করে দুর্যোগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়। কাগজেপত্রে ১৮ দন্ড- স্থাপনের কথা উল্লেখ করা হলেও খোঁজ নিয়ে হাটবাজার ও জনবহুল এলাকায় মোট ২৪টি দন্ড- স্থাপনের বিষয়টি জানা গেছে। দুর্গম হাওরের বৃক্ষহীন খোলা প্রান্তর বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় স্থানে এগুলো বসানো হয়েছে দাবি স্থানীয়দের।
৪০ ফুট উচ্চতার এই দন্ড চারপাশের ১১০ মিটার জায়গাজুড়ে বজ্রপাত নিরোধের সক্ষমতা রাখে। কিন্তু স্থাপনের পর থেকে এই যন্ত্রগুলো বজ্রপাত নিরোধ করতে পেরেছে এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। এমনকি এই দন্ড- সচল না অচল, এ সম্পর্কিত নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেনি জেলা ও উপজেলার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন।

মৃত্যুর দিক বিবেচনায় ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে সরকার। প্রকৃতিগত এই দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকার বজ্র নিরোধক দন্ড স্থাপনের পাশাপাশি তালগাছ রোপণের প্রকল্পও হাতে নিয়েছিল। যার অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় ৪০ হাজার তালগাছ রোপণ করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তালগাছের দৃশ্যমান কোন অস্তিত্ব নেই। এ প্রকল্পেও আশানুরূপ ফল না পাওয়ার অভিযোগ আছে। বজ্রদন্ড স্থাপন হয়েছে এমন একাধিক স্থান ঘুরে দেখা যায়, জামালগঞ্জের সাচনা বাজার, ভীমখালী বাজার, উপজেলা পরিষদ ভবন ও বেহেলী বাজারের যেসব স্থানে দন্ড স্থাপন করা হয়েছে সেই জায়গাগুলোতে বজ্রপাত ঝুঁকি কম। এসব স্থানে একটু বৃষ্টি হলে মানুষ যেকোন জায়গায় সহজে আশ্রয় নিতে পারে। এই দন্ড স্থাপন ও কার্যকারিতার বিষয়ে তেমন কিছু জানেন না স্থানীয়রা।
সাচনা বাজারে বজ্রদন্ড স্থাপনের বিষয়টি হাস্যকর বলেছেন ওই বাজারের ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিন তালুকদার। তিনি বলেন, বজ্রপাতে জেলে ও কৃষিজীবী মানুষ বেশি মারা যায়। হাটবাজারে অবস্থানরত মানুষ বজ্রপাতে নিহত হয়েছে এমন খবর শুনিনি। দন্ড- স্থাপনে গবেষক ও স্থানীয়দের মতামত নেওয়া উচিত ছিল। ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আকতারুজ্জামান তালুকদার বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে কৃষক-জেলে যেন নিরাপদে থাকতে পারে, সে জন্য বজ্র নিরোধক দন্ড হাওরের নির্জন স্থানে করার কথা। সেই দন্ড ভুল জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে। বজ্রঝুঁকি কমাতে সরকারিভাবে কোথাও তালগাছ রোপণ করতে দেখিনি। তবে ব্র্যাক সংস্থা থেকে কিছু তালগাছ লাগানো হয়েছিল। সেগুলো পরিচর্যার অভাবে মরে গেছে।
সুনামগঞ্জ ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ এর সহযোগী সংগঠন হাওর রক্ষায় আমরা’র সদস্য সজল কান্তি সরকার বলেন, এই দন্ড- দুর্গম হাওরের বদলে গাছপালাযুক্ত জনবহুল স্থানে বসানো হয়েছে। যেখানে বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি নেই বললেই চলে। মনে হয় অসুস্থ রোগীর সেবা-শুশ্রƒষা না করে সুস্থ লোকে সেবা-শুশ্রƒষা করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় বসালে এর কার্যকারিতা জানা যেত। এগুলো দায়সারা কার্যক্রম ছাড়া আর কিছুই না।

দন্ড স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েটিভ সোলার এন্ড টেকনোলজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা নাসরিন বলেন, গত দুই মাস আগে পরীক্ষা করে দেখেছি সব ঠিক আছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন আমরা উপজেলা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দিয়েছি। আমাদের দুই বছরের ওয়ারেন্টি (নিশ্চয়তা) শেষ হয়েছে। এখনও আমরা জামানত পাইনি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হাসিবুল হাসান বলেন, দন্ড গুলো সচল আছে কিনা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাদের (পিআইও) কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তারা এর কার্যকারিতা নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। দন্ডগুলো পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলা হলেও তারা প্রতিবেদন দেয়নি। তাই তাদের জামানত আটক রাখা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলার ১২টি উপজেলাতে দন্ড স্থাপনের ব্যাপারে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে পত্র পাঠানো হয়েছিল। পরে ৬ উপজেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দন্ডগুলো স্থাপন করা হয়েছে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : dailysunamkantha@gmail.com
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com