হাওরে বহুমাত্রিক সংকট, কৃষকের পাশে দাঁড়ান

আপলোড সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ১২:১১:২৮ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৩-০৪-২০২৬ ১২:১১:২৮ অপরাহ্ন
হাওরাঞ্চল বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার এক গুরুত্বপূর্ণ ভরকেন্দ্র। প্রতি বছর বোরো মৌসুমে এখানকার কৃষকেরা জীবন-জীবিকার সব ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নামেন, দেশের ধানভা-ার সমৃদ্ধ করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই কৃষকরাই পড়েছেন এক বহুমাত্রিক সংকটে- ডিজেল ঘাটতি, কম্বাইন হারভেস্টারের অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট এবং ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বাস্তবতায় তাদের অস্তিত্বই যেন হুমকির মুখে। প্রথমত, জ্বালানি সংকটের বিষয়টি শুধু সরবরাহের ঘাটতি নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার প্রতিফলন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকৃত সংকট নেই; কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। কৃষক ও হারভেস্টার মালিকরা যখন প্রয়োজনীয় ডিজেল পাচ্ছেন না, তখন তা সরাসরি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। কৃষিকাজে সময় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান - ধান কাটতে দেরি মানেই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল হারানোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাওয়া। দ্বিতীয়ত, যান্ত্রিক কৃষির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও সেই যন্ত্রের ব্যয় এখন কৃষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এক বছর আগে যেখানে প্রতি একর জমি কাটতে ৪-৫ হাজার টাকা খরচ হতো, সেখানে এখন তা ৭-১২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। এই ব্যয়বৃদ্ধি শুধু ডিজেলের কারণে নয়, বরং সামগ্রিক কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির ফল। ফলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বেড়েছে, কিন্তু বাজারে ধানের দাম উল্টো কমে গেছে - এ এক নির্মম বৈপরীত্য। তৃতীয়ত, শ্রমিক সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। অনেক জায়গায় হারভেস্টার ঢুকতে না পারায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে বেশি মজুরিতে শ্রমিক নিয়োগ করতে হচ্ছে। এতে ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনাও বাড়ছে, যা কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলকে মুহূর্তেই ধ্বংস করে দিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো ধানের বাজারদর। যেখানে উৎপাদন খরচ লাগামছাড়া, সেখানে ধানের দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। কাঁচা ধান ৫০০ টাকা মণ এবং শুকনো ধান ৮০০ টাকায় বিক্রি হওয়া কৃষকের জন্য নিঃসন্দেহে লোকসানের সমান। এতে ঋণগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা বাড়বে, যা ভবিষ্যতে কৃষি খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। দ্রুত সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি, কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে ভর্তুকি বৃদ্ধি, ডিজেল সরবরাহ সহজীকরণ এবং কৃষি ঋণের সুদ কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে আরও কার্যকরভাবে তদারকি করতে হবে যাতে জ্বালানি সরবরাহে কোনো কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না হয়। হাওরের কৃষক শুধু একজন উৎপাদক নন, তিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার রক্ষাকবচ। তার ক্ষতি মানে গোটা জাতির ক্ষতি। তাই এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। অন্যথায়, একসময় কৃষকেরা চাষাবাদে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন - যার পরিণতি হবে ভয়াবহ। এখনই সময় বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়ার, কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর। কারণ, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে।

সম্পাদকীয় :

  • সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি : মো. জিয়াউল হক
  • সম্পাদক ও প্রকাশক : বিজন সেন রায়
  • বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : মোক্তারপাড়া রোড, সুনামগঞ্জ-৩০০০।

অফিস :

  • ই-মেইল : [email protected]
  • ওয়েবসাইট : www.sunamkantha.com