উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বোরো ধান কাটার মৌসুম সাধারণত উৎসবমুখর সময়। কিন্তু চলতি বছরে সেই উৎসবের আবহ বিষণœতায় রূপ নিয়েছে। অকাল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কায় কৃষকের মুখে হাসির বদলে উদ্বেগের ছাপ স্পষ্ট। দেশের খাদ্যভা-ার হিসেবে পরিচিত হাওরাঞ্চলের এই সংকট কেবল আঞ্চলিক নয়, জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
হাওরাঞ্চলের কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। জলবায়ুর সামান্য পরিবর্তনও এখানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ুর অস্বাভাবিক আচরণ - অসময়ে বৃষ্টি, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা - এই অঞ্চলের কৃষিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। চলতি মৌসুমে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দেয়।
দেশের মোট বোরো ধানের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে। ফলে এ অঞ্চলের ফসলহানি সরাসরি জাতীয় খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে ২০১৭ সালের আগাম বন্যার অভিজ্ঞতা এখনও মানুষের মনে তাজা। সেই পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা আজও কৃষকদের তাড়া করে ফিরছে।
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃষিযন্ত্রের স্বল্পতা ও অচলাবস্থা। প্রয়োজনীয় সংখ্যক কম্বাইন হারভেস্টার না থাকা, বিদ্যমান যন্ত্রের বড় অংশ মেরামতের অভাবে অকেজো হয়ে পড়া এবং খুচরা যন্ত্রাংশের সংকট - সব মিলিয়ে ধান কাটার গতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষক বাধ্য হয়ে অধিক ব্যয়বহুল শ্রমনির্ভর পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন, যা তাদের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, দ্রুত ধান কাটার জন্য সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। অচল হারভেস্টারগুলো দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক যন্ত্র সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, কৃষিযন্ত্রে পুনরায় ভর্তুকি চালু করে নতুন যন্ত্র আমদানিতে উৎসাহ দেওয়া উচিত। তৃতীয়ত, ফসলরক্ষা বাঁধগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখতে হবে, যাতে সম্ভাব্য বন্যার ক্ষতি কমানো যায়। পাশাপাশি, দীর্ঘমেয়াদে হাওরাঞ্চলের জন্য টেকসই কৃষি পরিকল্পনা গ্রহণ অপরিহার্য। জলবায়ু সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ছাড়া এই সংকট থেকে স্থায়ী উত্তরণ সম্ভব নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- হাওরের কৃষককে একা ফেলে রাখা যাবে না। তাদের শ্রম, ঘাম ও উৎপাদনের ওপরই নির্ভর করছে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা। তাই এই সংকট মোকাবেলায় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি বিভাগ এবং সমাজের সকল স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।
হাওরের এই সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে- জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি এখনকার চ্যালেঞ্জ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর মূল্য দিতে হবে পুরো জাতিকেই।