বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত এক নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় এ ঝুঁকি আরও তীব্র। খোলা আকাশের নিচে দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকার কারণে প্রতি বছরই বহু কৃষক প্রাণ হারাচ্ছেন। এ বাস্তবতায় হাওরাঞ্চলে ‘মাল্টিপারপাস শেড’ নির্মাণের সরকারি উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়।
প্রস্তাবিত এই শেডগুলো কেবল বজ্রপাতের সময় আশ্রয় নেওয়ার স্থানই হবে না, বরং ধান মাড়াই, অস্থায়ী ফসল সংরক্ষণ এবং বন্যাকালে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হবে - যা গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নে বহুমাত্রিক ভূমিকা রাখবে। বাস্তবতার নিরিখে এটি একটি কার্যকর ও টেকসই পরিকল্পনা বলেই প্রতীয়মান হয়।
এতদিন বজ্রপাত মোকাবেলায় তালগাছ রোপণ বা বজ্রনিরোধক দ- স্থাপনের মতো উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারবিধির অভাবে এসব উদ্যোগ কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। তাই এবার অবকাঠামোগত সমাধানের দিকে ঝুঁকছে সরকার - এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
তবে পরিকল্পনা যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই এর সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক উন্নয়ন প্রকল্প কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকেছে বা দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় কাক্সিক্ষত সুফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই মাল্টিপারপাস শেড নির্মাণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। কোন এলাকায় কতটি শেড প্রয়োজন, কোথায় স্থাপন করলে সর্বোচ্চ উপকার মিলবে - এসব বিষয়ে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। একইসঙ্গে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বজ্রপাতের সময় কী করণীয়, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে - এসব বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ না করা। বজ্রপাতের মৌসুম ইতোমধ্যেই অনিয়মিত হয়ে উঠেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর প্রকোপ বাড়ছে। তাই দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রকল্পটি অনুমোদন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।